লাতিন আমেরিকার ভূ-রাজনীতিতে নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখতে এবার আরও আক্রমণাত্মক অবস্থানে পৌঁছেছে যুক্তরাষ্ট্র। ভেনেজুয়েলার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞার অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিক জলসীমায় তেলবাহী জাহাজ লক্ষ্য করে একের পর এক অভিযান চালাচ্ছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে রাশিয়ার পতাকাবাহী ট্যাঙ্কার জব্দের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার ক্যারিবিয়ান সাগরে ‘ওলিনা’ নামে আরও একটি তেলবাহী ট্যাঙ্কার জব্দ করেছে মার্কিন সাউদার্ন কমান্ড (US Southern Command)।
ক্যারিবিয়ান সাগরে মার্কিন অভিযান ও পঞ্চম ট্যাঙ্কার জব্দ
শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, কোনো ধরনের বড় সংঘাত ছাড়াই অত্যন্ত সুকৌশলে ওলিনা ট্যাঙ্কারটিকে তাদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়েছে। যদিও ওয়াশিংটন আনুষ্ঠানিকভাবে ট্যাঙ্কারটি আটক করার সুনির্দিষ্ট কারণ ব্যাখ্যা করেনি, তবে প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ (Wall Street Journal) দাবি করেছে, রাশিয়ার তেল পরিবহনের মাধ্যমে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা (Sanctions) লঙ্ঘনের দায়ে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, ভেনেজুয়েলা সংকটের মধ্যে এটি যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আটক হওয়া পঞ্চম তেলের ট্যাঙ্কার।
এর আগে গত বুধবার (৭ জানুয়ারি) উত্তর আটলান্টিকে দুই সপ্তাহের দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর ‘মেরিনেরা’ (যা ‘বেলা-১’ নামেও পরিচিত) নামক একটি রুশ পতাকাবাহী জাহাজ আটক করেছিল মার্কিন কোস্টগার্ড।
তদন্তের মুখে নাবিকদল ও রাশিয়ার তীব্র প্রতিবাদ
মার্কিন বিচার বিভাগ (Department of Justice) জানিয়েছে, আটককৃত রুশ জাহাজের ক্রুদের বিরুদ্ধে কঠোর তদন্ত শুরু হয়েছে। কোস্টগার্ডের নির্দেশ অমান্য করা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতি লঙ্ঘনের অভিযোগে তাদের বিচারের মুখোমুখি করা হতে পারে। এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে ‘জলদস্যুতা’ ও আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইনের চরম লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে রাশিয়া। ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ১৯৮২ সালের জাতিসংঘের সমুদ্র আইন (UN Convention on the Law of the Sea) অনুযায়ী উন্মুক্ত সমুদ্রে জাহাজ চলাচলের পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে। কোনো দেশ অন্য দেশের সার্বভৌমত্ব ও বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর এভাবে শক্তি প্রয়োগ করতে পারে না।
মাদুরো পরবর্তী ভেনেজুয়েলা: ট্রাম্পের ‘অয়েল গেম’
ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের নজিরবিহীন হস্তক্ষেপ এখন বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। গত শনিবার (৩ জানুয়ারি) মাদক পাচারের অভিযোগে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও ফার্স্ট লেডি সিলিয়া ফ্লোরেসকে তাদের নিজ দেশ থেকে অনেকটা ‘অপহরণ’ স্টাইলে আটক করে নিউইয়র্কে নিয়ে যায় মার্কিন বাহিনী। এই ঘটনার পরপরই ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন, এখন থেকে ভেনেজুয়েলার শাসনভার ও বিশাল তেল ভাণ্ডারের (Oil Reserves) নিয়ন্ত্রণ থাকবে আমেরিকার হাতেই।
বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার আশঙ্কা
ট্রাম্প প্রশাসন সাফ জানিয়ে দিয়েছে, ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদ ব্যবহার করে কোনো রাষ্ট্র বা সংস্থা যেন লাভবান হতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে সামরিক শক্তি ব্যবহার করা হবে। বিশেষ করে রাশিয়া ও চীনের সাথে ভেনেজুয়েলার সম্পর্ক ছিন্ন করতেই এই কঠোর ‘মেরিন ব্লকেড’ বা সমুদ্র অবরোধ গড়ে তোলা হয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ওপেক (OPEC) প্লাস দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করে গ্লোবাল অয়েল মার্কেট (Global Oil Market) নিয়ন্ত্রণ করাই এখন ওয়াশিংটনের মূল লক্ষ্য।
ভেনেজুয়েলা ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের এই মারমুখী অবস্থান এবং ধারাবাহিকভাবে তেলের ট্যাঙ্কার জব্দের ঘটনা বিশ্বজুড়ে নতুন করে স্নায়ুযুদ্ধের উত্তাপ ছড়িয়ে দিচ্ছে। একদিকে মস্কোর হুঁশিয়ারি এবং অন্যদিকে ওয়াশিংটনের ‘ভেনেজুয়েলা মাস্টারপ্ল্যান’—সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক কূটনীতি এখন এক কঠিন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে।