সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় শহর আলেপ্পোয় দীর্ঘ তিনদিনের নজিরবিহীন রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর অবশেষে যুদ্ধবিরতি (Ceasefire) ঘোষণা করেছে দেশটির সরকার। শুক্রবার সিরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক বিশেষ বিবৃতিতে এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। মূলত বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মানবিক বিপর্যয় এড়ানোর লক্ষ্যেই আসাদ প্রশাসন এই যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আলেপ্পোর রণক্ষেত্রে সাময়িক বিরতি
বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, আলেপ্পোর কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা শেখ মাকসুদ, আল-আশরাফিয়েহ এবং বনি জায়েদ অঞ্চলে এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে। তবে এই চুক্তির অংশ হিসেবে কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠী সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্স (SDF)-কে এসব এলাকা অবিলম্বে ত্যাগ করার নির্দেশ দিয়েছে সিরীয় সেনাবাহিনী। সরকারি বাহিনীর দাবি, সংঘাত এড়াতে এবং এলাকায় স্থিতিশীলতা ফেরাতে সশস্ত্র যোদ্ধাদের প্রত্যাহার জরুরি।
ভয়াবহ প্রাণহানি ও মানবিক বিপর্যয় (Humanitarian Crisis)
গত মঙ্গলবার থেকে শুরু হওয়া এই তিনদিনের সংঘাতে সিরীয় বাহিনী এবং এসডিএফ-এর মধ্যে ব্যাপক গোলাগুলি ও সংঘর্ষ হয়। রিপোর্ট অনুযায়ী, এই সংক্ষিপ্ত সময়ের যুদ্ধে অন্তত ২২ জন প্রাণ হারিয়েছেন। তবে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে সাধারণ মানুষের বাস্তুচ্যুতি (Internal Displacement)। জাতিসংঘের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মাত্র তিন দিনে ৪৬ হাজারেরও বেশি মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে বেরিয়ে পড়েছেন।
আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ ও প্রতিক্রিয়া
সিরিয়ার এই নতুন উত্তেজনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। তাঁর মুখপাত্র স্টিফেন দুজারিক এক বিবৃতিতে সব পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন। জাতিসংঘ মনে করছে, এই মুহূর্তে নতুন করে কোনো বড় ধরনের সংঘাত শুরু হলে তা মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতাকে আরও উসকে দিতে পারে।
এদিকে, তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান এই সংঘাতের জন্য সরাসরি কুর্দি যোদ্ধাদের দায়ী করেছেন। তাঁর মতে, ‘এসডিএফ সিরিয়ায় শান্তি প্রক্রিয়ার পথে সবচেয়ে বড় বাধা।’ অন্যদিকে, সিরিয়ার কুর্দি নেতা মজলুম আবদি অভিযোগ তুলেছেন যে, আলেপ্পোর এই সংঘর্ষ দামেস্কের সঙ্গে তাঁদের চলমান রাজনৈতিক আলোচনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করার একটি পরিকল্পিত চেষ্টা।
ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ (Geopolitical Equation)
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই যুদ্ধবিরতি কেবল সাময়িক স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদী শান্তির নিশ্চয়তা দিচ্ছে না। আলেপ্পোর দখল ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আসাদ প্রশাসন এবং কুর্দি বাহিনীর মধ্যেকার বিরোধ অত্যন্ত গভীরে। এই যুদ্ধবিরতির ফলে মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর পথ সুগম হলেও, এসডিএফ শেষ পর্যন্ত এলাকা ছাড়বে কি না—তা নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে। এই অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা প্রশমনে বিশ্বশক্তির হস্তক্ষেপ জরুরি হয়ে পড়েছে বলে মনে করছে কূটনৈতিক মহল।