ইরানে বিদ্যমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে এবার চূড়ান্ত কঠোর হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে দেশটির ক্ষমতাধর সামরিক বাহিনী ‘ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর’ (IRGC)। দীর্ঘস্থায়ী এই অস্থিরতার জন্য সরাসরি ‘সন্ত্রাসীদের’ দায়ী করে তেহরান জানিয়েছে, ইসলামি শাসন ব্যবস্থা রক্ষায় তারা যেকোনো চরম পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত কয়েকদিনের সংঘাতে ইতিমধ্যে কয়েক ডজন মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং পরিস্থিতি ক্রমশ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
বিপ্লবী গার্ডের হুঁশিয়ারি ও ‘সন্ত্রাস’ তত্ত্ব
শনিবার (১০ জানুয়ারি) তেহরানের প্রভাবশালী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এক বিবৃতিতে জানায়, চলমান বিক্ষোভ আর সাধারণ মানুষের অসন্তোষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত নাশকতায় পরিণত হয়েছে। তারা অভিযোগ করেছে, বিদেশি মদদপুষ্ট গোষ্ঠীগুলো এই অরাজকতার সুযোগ নিয়ে দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। বিক্ষোভকারীদের দমনে প্রশাসনের এই কঠোর অবস্থানের ফলে সামনের দিনগুলোতে রাজপথে সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি ও আন্তর্জাতিক উত্তেজনা
ইরানের অভ্যন্তরীণ এই অস্থিরতায় ঘি ঢেলেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন সতর্কতা। ট্রাম্প স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, ইরানের বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়ন চললে যুক্তরাষ্ট্র তাতে সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারে। ওয়াশিংটনের এমন বার্তায় তেহরান আরও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। এদিকে, বিক্ষোভের প্রকৃত চিত্র আড়াল করতে ইরান সরকার দেশজুড়ে ইন্টারনেট সংযোগ (Internet Connectivity) বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। এতে করে ঠিক কতজন মানুষ হতাহত হয়েছেন বা কোন শহরের পরিস্থিতি কেমন, তা সঠিকভাবে জানা কঠিন হয়ে পড়ছে।
বিদ্রোহের রূপ নিচ্ছে বিক্ষোভ
আন্দোলন কেবল রাজপথেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন রাজনৈতিক বিদ্রোহের রূপ নিচ্ছে। ইরানের নির্বাসিত শাহের পুত্র, যিনি বর্তমানে বিরোধী শিবিরের অন্যতম পরিচিত কণ্ঠস্বর, তিনি বিক্ষোভকারীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন এই আন্দোলনকে একটি পূর্ণাঙ্গ বিপ্লবে রূপান্তর করতে। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, তেহরানের পশ্চিমে কারাজ এলাকায় একটি পৌর ভবনে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে উত্তেজিত জনতা। এছাড়া সিরাজ, কোম এবং হামেদান শহরে নিহত নিরাপত্তা কর্মীদের শেষকৃত্যের ফুটেজ প্রচার করে প্রশাসন বোঝাতে চাইছে যে, নিরাপত্তা বাহিনীও বড় ধরণের হামলার শিকার হচ্ছে।
অর্থনৈতিক সংকট থেকে রাজনৈতিক দাবি
গত ২৮ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভের মূলে ছিল আকাশচুম্বী মুদ্রাস্ফীতি (Inflation) এবং ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়। তবে দ্রুতই তা রাজনৈতিক রূপ নেয় এবং বিক্ষোভকারীরা সরাসরি দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের পতন দাবি করে স্লোগান দিতে শুরু করে। ইরান সরকার এই অস্থিরতার নেপথ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থাকে দায়ী করে আসছে।
হতাহতের পরিসংখ্যান ও গণ-গ্রেফতার
ইরানের মানবাধিকার সংস্থা ‘এইচআরএএনএ’ (HRANA)-এর তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েকদিনের সহিংসতায় এ পর্যন্ত অন্তত ৫০ জন বিক্ষোভকারী এবং ১৫ জন নিরাপত্তা কর্মী নিহত হয়েছেন। এছাড়া ধরপাকড় অভিযানের মাধ্যমে প্রায় ২,৩০০ জনকে গ্রেফতার (Arrest) করা হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো অভিযোগ করেছে যে, গ্রেফতারকৃতদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হতে পারে এবং বিনা বিচারে তাদের দীর্ঘ সময় আটকে রাখা হচ্ছে।
বিশ্ব রাজনীতিতে ইরানের এই বর্তমান পরিস্থিতি ‘Regional Stability’ বা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তেহরান যদি আরও কঠোরভাবে বিক্ষোভ দমন শুরু করে, তবে তা মধ্যপ্রাচ্যে এক নতুন সংকটের জন্ম দিতে পারে।