বগুড়ার শিবগঞ্জে প্রশাসনের চোখে ধুলো দিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে পরিচালিত হওয়া একটি বিশাল অবৈধ সিগারেট কারখানার সন্ধান পেয়েছে সেনাবাহিনী। চাঞ্চল্যকর এই অভিযানে কেবল বিপুল পরিমাণ জাল সামগ্রীই উদ্ধার হয়নি, বরং উন্মোচিত হয়েছে কাস্টমস ও ভ্যাট বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে এই অবৈধ চক্রের গভীর যোগসাজশের নজির। সোমবার (১২ জানুয়ারি) দিবাগত রাত থেকে মঙ্গলবার সকাল ৯টা পর্যন্ত চলা এই ঝটিকা অভিযানে শিবগঞ্জের খয়ারপুকুর এলাকায় এক ভয়াবহ জালিয়াতির চিত্র ফুটে ওঠে।
মধ্যরাতের ঝটিকা অভিযান ও বিপুল সম্পদ জব্দ
গোপন গোয়েন্দা তথ্যের (Intelligence) ভিত্তিতে সেনাবাহিনীর বগুড়া সদর ক্যাম্পের কমান্ডার ক্যাপ্টেন জানে আলম সাদিফ ও লেফটেন্যান্ট আল ফাহাদের নেতৃত্বে এই বিশেষ অপারেশন পরিচালিত হয়। সেনাসূত্রে জানা গেছে, নামবিহীন ওই ফ্যাক্টরিতে অভিযানে গিয়ে দেখা যায় সেখানে অত্যন্ত নিম্নমানের পরিবেশে সিগারেট উৎপাদন হচ্ছে।
অভিযান শেষে সেনাবাহিনী জানায়, কারখানাটি থেকে প্রায় ১০ কোটি টাকা বাজারমূল্যের (Market Value) অত্যাধুনিক সিগারেট উৎপাদনের সরঞ্জাম বা মেশিনারি জব্দ করা হয়েছে। এ ছাড়া উদ্ধার করা হয়েছে ১৫ লাখ টাকা সমমূল্যের নকল ব্যান্ডরোল, ১০ লাখ টাকার ভুয়া মোড়ক এবং অনুমোদনহীন ১৪টি ভিন্ন ব্র্যান্ডের সিগারেটের প্যাকেট। সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্য হলো, সাধারণ মানুষকে ধোঁকা দিতে তামাকের সঙ্গে কাঠের গুঁড়া মিশিয়ে অত্যন্ত স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ সিগারেট প্রস্তুত করা হচ্ছিল। কারখানা থেকে প্রায় ১০ মণ এমন বিষাক্ত তামাকও উদ্ধার করা হয়।
রাজস্ব কর্মকর্তার স্বাক্ষরে ‘বৈধতা’র খেলা
অভিযানের সময় কারখানার মালিক শাহীনুর রহমান পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও আটক করা হয় পাঁচজন শ্রমিককে। তবে এই অভিযানের সবচেয়ে বড় মোড় আসে আটককৃতদের স্বীকারোক্তিতে। কর্মচারীদের দাবি, রাজস্ব কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধান ও উপস্থিতিতেই এখানে উৎপাদন চলত।
ঘটনার সত্যতা মেলে যখন ভ্রাম্যমাণ আদালত (Mobile Court) তল্লাশি চালিয়ে কারখানার অফিসিয়াল 'স্টক রেজিস্ট্রার' উদ্ধার করে। সেখানে দেখা যায়, বগুড়া কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট অফিসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মোর্শেদা আলমের নিয়মিত স্বাক্ষর রয়েছে। কোনো ধরনের ট্রেড লাইসেন্স বা সরকারি অনুমোদন (Regulatory Approval) ছাড়াই একটি অবৈধ প্রতিষ্ঠানে কীভাবে একজন গেজেটেড কর্মকর্তা নিয়মিত স্বাক্ষর দিয়ে আসছিলেন, তা নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
দায় এড়ানোর চেষ্টা ও প্রশাসনের অবস্থান
বিষয়টি নিয়ে উপস্থিত কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট অফিসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা লিটন কুমার সেনের কাছে জানতে চাইলে তিনি কোনো সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি। সংবাদমাধ্যমকে তিনি দায়সারাভাবে বলেন, “একটি পক্ষ অনুমোদনের আবেদন করেছিল, তাই হয়তো এখানে কার্যক্রম চলত। নকল মোড়ক বা অবৈধ কর্মকাণ্ড সম্পর্কে আমার সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য জানা নেই।”
পরবর্তীতে পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালতে আটককৃত কর্মচারীদের ২ লাখ টাকা জরিমানা প্রদান করা হয়। শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জিয়াউর রহমান বলেন, “অভিযান শেষে নামবিহীন ওই অবৈধ প্রতিষ্ঠানটি সিলগালা করে দেয়া হয়েছে। জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি এবং সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেয়ার এই প্রক্রিয়ায় রাজস্ব কর্মকর্তাদের কোনো যোগসাজশ আছে কি না, তা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দোষীদের কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না।”
জনস্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের নকল সিগারেট মার্কেট শেয়ার (Market Share) দখল করলে সরকার যেমন কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারায়, তেমনি তামাকের সঙ্গে কাঠের গুঁড়ার মিশ্রণ সাধারণ মানুষের জন্য মরণব্যাধি সৃষ্টি করতে পারে। দেশের টোব্যাকো ইন্ডাস্ট্রি এবং কমপ্লায়েন্স (Compliance) নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এ ধরনের দুর্নীতি বড় বাধা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। শিবগঞ্জের এই ঘটনাটি স্থানীয় প্রশাসনের দুর্নীতি বিরোধী অভিযানের গুরুত্বকে পুনরায় সামনে নিয়ে এসেছে।