আর্কটিক অঞ্চলের ভূ-রাজনীতি (Geopolitics) ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে চলমান চরম উত্তেজনার মধ্যেই ওয়াশিংটনে এক হাই-প্রোফাইল বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্র, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের শীর্ষ নীতিনির্ধারকরা। বুধবার (১৪ জানুয়ারি) হোয়াইট হাউসে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে বলে নিশ্চিত করেছে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপি। বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে নেতৃত্ব দেবেন নবনির্বাচিত ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং হবু পররাষ্ট্রমন্ত্রী (Secretary of State) মার্কো রুবিও।
বৈঠকের প্রেক্ষাপট ও ডেনমার্কের তৎপরতা
ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোক্কে রাসমুসেন মঙ্গলবার সাংবাদিকদের জানান, তিনি নিজে এবং গ্রিনল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিভিয়ান মোৎজফেল্ডট মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে এই আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তবে বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনা করে স্বয়ং মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এই বৈঠকে সরাসরি অংশ নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং আলোচনার উদ্যোগ ত্বরান্বিত করেন।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, হোয়াইট হাউসের এই আমন্ত্রণ কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং আর্কটিক সার্কেলে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থ (Strategic Interest) ও ডেনমার্কের সঙ্গে বিদ্যমান শীতল সম্পর্ক নিরসনের একটি বড় চেষ্টা।
ট্রাম্পের হুমকি ও ন্যাটোর অস্তিত্ব রক্ষা
এই বৈঠকের নেপথ্যে রয়েছে ডনাল্ড ট্রাম্পের সেই বিতর্কিত ঘোষণা। গত কয়েক বছর ধরেই ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত করার বা ‘দখল’ করার প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়ে আসছেন। তার এই অবস্থান ডেনমার্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের মিত্রতায় বড় ধরনের ফাটল ধরিয়েছে। শুধু তাই নয়, পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর (NATO) অভ্যন্তরেও এটি একটি বড় ধরনের অস্বস্তি তৈরি করেছে। গ্রিনল্যান্ডের মতো একটি বিশাল দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এই টানাপোড়েন যদি দীর্ঘায়িত হয়, তবে তা ন্যাটোর নিরাপত্তা কাঠামোর জন্য একটি ‘অস্তিত্বগত সংকট’ (Existential Crisis) তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা।
আর্কটিক নিরাপত্তা ও ন্যাটোর অবস্থান
অন্যদিকে, কেবল ওয়াশিংটন সফরই নয়, ডেনমার্কের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ট্রোলস লুন্ড পউলসেন ন্যাটোর নবনিযুক্ত মহাসচিব মার্ক রুটের সঙ্গেও বৈঠকে বসছেন। এই আলোচনায় মূল কেন্দ্রবিন্দু থাকবে আর্কটিক অঞ্চলের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি (Security Landscape)। রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান সামরিক উপস্থিতি এবং উত্তর মেরুর সম্পদ দখলের প্রতিযোগিতায় ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডকে পাশে পাওয়া ন্যাটোর জন্য অত্যন্ত জরুরি। ডেনিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী নিশ্চিত করেছেন যে, ন্যাটোর এই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় গ্রিনল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিভিয়ান মোৎজফেল্ডটও উপস্থিত থাকবেন, যা দ্বীপটির স্বায়ত্তশাসন ও রাজনৈতিক গুরুত্বকে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করবে।
কূটনৈতিক গুরুত্ব ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা
বুধবারের এই বৈঠকে মূলত তিনটি বিষয় প্রাধান্য পাবে: ১. গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও ওয়াশিংটনের অবস্থান স্পষ্ট করা। ২. আর্কটিক অঞ্চলে সামরিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি। ৩. ট্রান্স-আটলান্টিক নিরাপত্তা ও ন্যাটোর ঐক্য বজায় রাখা।
ট্রাম্প প্রশাসনের আগামী দিনের পররাষ্ট্রনীতিতে গ্রিনল্যান্ড কতটুকু গুরুত্ব পাবে এবং জেডি ভ্যান্সের এই মধ্যস্থতা কতটা ফলপ্রসূ হবে, সেদিকেই এখন তাকিয়ে আছে বিশ্ব কূটনীতি। ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের জন্য এই বৈঠকটি কেবল সীমান্ত রক্ষার নয়, বরং নিজেদের রাজনৈতিক সম্মান ও স্বকীয়তা বজায় রাখারও বড় চ্যালেঞ্জ।