দেশজুড়ে চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলনের মাঝেই আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে চরম উত্তেজনার পারদ চড়ালো ইরান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রচ্ছন্ন হুমকির প্রেক্ষিতে তেহরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ওয়াশিংটন যদি ইরানি ভূখণ্ডে কোনো ধরনের সামরিক আগ্রাসন চালায়, তবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন Military Base বা সামরিক ঘাঁটিগুলোতে ভয়াবহ পাল্টা আঘাত হানা হবে। বিশেষ করে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং তুরস্কে মোতায়েনকৃত মার্কিন বাহিনীর ওপর এই হামলার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
আঞ্চলিক প্রতিবেশী ও ওয়াশিংটনকে কড়া হুঁশিয়ারি
সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের বরাতে ‘ইরান ইন্টারন্যাশনাল’ এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, একজন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তেহরান ইতিমধ্যেই কূটনৈতিক চ্যানেল ব্যবহার করে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও তুরস্ককে তাদের অবস্থানের কথা জানিয়ে দিয়েছে। ওই কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, "যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানকে লক্ষ্য করে কোনো হামলা চালায়, তবে ওই দেশগুলোর মাটিতে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো আমাদের টার্গেট লিস্টে থাকবে।" ইরান এই দেশগুলোকে অনুরোধ করেছে যেন তারা তাদের ভূমি ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সম্ভাব্য হামলা ঠেকাতে কার্যকর ভূমিকা পালন করে।
দেশের ভেতরে টালমাটাল পরিস্থিতি: অব্যাহত সরকারবিরোধী বিক্ষোভ
বাইরের দেশের সঙ্গে এই যুদ্ধংদেহী মনোভাবের সমান্তরালে ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও ক্রমেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। দেশটিতে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ তৃতীয় সপ্তাহে পদার্পণ করেছে। ইন্টারনেটে ব্ল্যাকআউট বা Internet Shutdown-এর কারণে সঠিক তথ্য বাইরে আসা কঠিন হয়ে পড়লেও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, বিক্ষোভ দমনে সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। এর মাঝেই বিক্ষোভের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে প্রথম মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে যাচ্ছে তেহরান প্রশাসন।
মৃত্যুদণ্ডের খড়গ: এরফান সোলতানি ও মানবাধিকার নিয়ে উদ্বেগ
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’ এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানিয়েছে, এরফান সোলতানি নামক ২৬ বছর বয়সী এক বিক্ষোভকারীকে বুধবার (১৪ জানুয়ারি) মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতে পারে। গত বৃহস্পতিবার তেহরানের উপকণ্ঠ কারাজ শহর থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। গ্রেফতারের পর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে অত্যন্ত গোপনীয়তা ও দ্রুততার সাথে তার বিচার এবং সাজা ঘোষণা করা হয়েছে, যাকে মানবাধিকার কর্মীরা ‘Fast-track Trial’ বা তড়িঘড়ি বিচার বলে অভিহিত করছেন।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের উদ্বেগ ও দমননীতির আশঙ্কা
বিশ্বখ্যাত মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি মনে করছে, বিক্ষোভকারীদের মধ্যে ভীতি সঞ্চার করতে এবং ভিন্নমত দমন করতে ইরানি কর্তৃপক্ষ আবারও বিচারবহির্ভূত বা নির্বিচার মৃত্যুদণ্ডের পথ বেছে নিচ্ছে। অ্যামনেস্টির প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ৮ জানুয়ারি থেকে সোলতানির পরিবারের সাথে তার সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে। এটি ইরানের বর্তমান আইনি প্রক্রিয়ার অস্বচ্ছতাকে আরও প্রকট করে তুলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও মার্কিন সামরিক হুমকির মোকাবিলা, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে বিশাল জনবিক্ষোভ সামলানো—ইরান সরকার এখন দ্বিমুখী সংকটে জর্জরিত। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার হুমকি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে যেমন প্রশ্নের মুখে ফেলছে, তেমনি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা ইরানের মানবাধিকার রেকর্ডকে বিশ্ব দরবারে আরও বিতর্কিত করে তুলছে।