আওয়ামী লীগ সরকারের টানা দেড় দশকের শাসনামলে গুম ও অমানবিক নির্যাতনের কেন্দ্রস্থল হিসেবে পরিচিতি পাওয়া র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) টাস্কফোর্স ইন্টারোগেশন (TFI) সেল পরিদর্শনের অনুমতি দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। বুধবার (১৪ জানুয়ারি) এক ঐতিহাসিক আদেশে আসামিপক্ষের আইনজীবীদের এই আবেদন মঞ্জুর করা হয়। এর ফলে গুম ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের রাখা হতো বলে অভিযোগ ওঠা এই ‘আঁতুড়ঘর’ প্রথমবারের মতো আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সরেজমিনে দেখার সুযোগ পাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলের আদেশ
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল আজ দুপুরে এই গুরুত্বপূর্ণ আদেশ প্রদান করেন। প্যানেলের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। এই আদেশের মাধ্যমে বিচারিক প্রক্রিয়ায় Transparency বা স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল ট্রাইব্যুনাল।
ঘটনাস্থল পরিদর্শনের যৌক্তিকতা
মামলার শুনানিতে আসামিপক্ষের আইনজীবী তাবারক হোসেন জানান, গুমের অভিযোগে দায়ের করা সাতজন আসামির পক্ষে তিনি লড়ছেন। প্রসিকিউশন তাদের ‘Formal Charge’ বা আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্রে র্যাবের টিএফআই সেলকে অপরাধের মূল ‘Scene of Crime’ বা ঘটনাস্থল হিসেবে উল্লেখ করেছে। ন্যায়বিচারের স্বার্থে এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের প্রস্তুতি নিতে ওই স্থানটি সরেজমিনে পরিদর্শন করা অপরিহার্য। আদালত আইনজীবীদের যুক্তি আমলে নিয়ে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে এই পরিদর্শন সম্পন্ন করার অনুমতি দিয়েছেন।
যৌথ পরিদর্শনে ডিফেন্স ও প্রসিকিউশন
আদেশ পরবর্তী এক প্রেস ব্রিফিংয়ে অ্যাডভোকেট তাবারক হোসেন বলেন, "প্রসিকিউশন যেহেতু এই সেলটিকে অপরাধের স্থান হিসেবে দাবি করছে, তাই আমরা জায়গাটি দেখতে চেয়েছি। ট্রাইব্যুনাল আমাদের আবেদন মঞ্জুর করেছেন।" তিনি আরও জানান যে, এই পরিদর্শনে প্রসিকিউশন দলও তাদের সঙ্গে থাকতে চেয়েছে। উভয় পক্ষ আলোচনার মাধ্যমে একটি সুবিধাজনক সময়ে আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে টিএফআই সেল পরিদর্শনে যাবেন।
আসামির জামিন ও শারীরিক অবস্থা নিয়ে শুনানি
এদিন টিএফআই সেল পরিদর্শনের পাশাপাশি দুটি বিশেষ আবেদন নিয়ে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে গুমের মামলার অন্যতম আসামি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাহাঙ্গীর আলমের জামিন আবেদন করা হয়েছিল। তার আইনজীবীরা জানিয়েছেন, জাহাঙ্গীর আলম বর্তমানে হৃদরোগে আক্রান্ত এবং তার উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন। ট্রাইব্যুনাল জামিন আবেদনটি সরাসরি খারিজ না করে ‘রেকর্ডে’ রেখেছেন, যা পরবর্তীতে বিবেচনার সুযোগ রাখে।
প্রসিকিউশনের অবস্থান
প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম আদালতের আদেশের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, আসামিপক্ষের আইনজীবীরা ঘটনাস্থল পরিদর্শনের যে অধিকার চেয়েছেন, আদালত তাতে সায় দিয়েছেন। এটি বিচারিক প্রক্রিয়ার একটি স্বাভাবিক অংশ এবং প্রসিকিউশনও এই প্রক্রিয়ায় পূর্ণ সহযোগিতা করবে।
বিশ্লেষকদের মতে, টিএফআই সেলের মতো স্পর্শকাতর স্থান পরিদর্শনের এই অনুমতি বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে একটি মাইলফলক। এটি কেবল গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের দীর্ঘদিনের যন্ত্রণার স্বীকৃতিই নয়, বরং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় বর্তমান ট্রাইব্যুনালের কঠোর অবস্থানেরই বহিঃপ্রকাশ।