মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে যুদ্ধের দামামা এখন আরও প্রবল। ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতাকে কেন্দ্র করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের ধারাবাহিক সামরিক হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে এবার নজিরবিহীন হুঁশিয়ারি দিল তেহরান। ইরানি নীতিনির্ধারকদের স্পষ্ট বার্তা—যদি কোনোভাবে ইরানের ভূখণ্ডে হামলা চালানো হয়, তবে তার প্রভাব কেবল দেশটির সীমান্তে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক ভয়াবহ অগ্নিকুণ্ডে পরিণত করবে তারা।
বৈধ লক্ষ্যবস্তু মার্কিন ঘাঁটি ও ইসরায়েল: গালিবাফের হুঁশিয়ারি
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এই উত্তেজনার পারদ আরও উসকে দিয়ে বলেছেন, তেহরান ‘পুরো অঞ্চলে আগুন জ্বালিয়ে দিতে’ পুরোপুরি প্রস্তুত। আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গালিবাফের এই মন্তব্য মূলত মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা মার্কিন সামরিক শক্তি এবং ওয়াশিংটনের আঞ্চলিক মিত্রদের প্রতি একটি সরাসরি ‘Red Line’ বা চরম সতর্কবার্তা।
তিনি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়ে জানান, যুদ্ধ শুরু হলে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন যুদ্ধজাহাজ, বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি (Military Bases) এবং খোদ ইসরায়েল হবে ইরানের ‘Legitimate Target’ বা বৈধ লক্ষ্যবস্তু। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই হুমকির মাধ্যমে ইরান মূলত ওয়াশিংটনকে এটিই বোঝাতে চাইছে যে, তাদের ওপর কোনো হামলা হলে তা পুরো অঞ্চলের Strategic Assets এবং স্থিতিশীলতাকে ধ্বংস করে দেবে।
শত্রুর জন্য থাকছে ‘বড় চমক’: প্রতিরক্ষামন্ত্রী
এদিকে ট্রাম্পের ‘Military Intervention’-এর হুমকির বিপরীতে ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আজিজ নাসিরজাদেহ এক নিরাপত্তা বৈঠকে শত্রুপক্ষকে সতর্ক করে দিয়েছেন। তিনি জানান, ইরানে হামলা চালানো হলে শত্রুর জন্য ‘অনেক চমক’ অপেক্ষা করছে যা তাদের ভাবনারও অতীত।
ইরানি সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভির বরাত দিয়ে জানা যায়, নাসিরজাদেহ বলেছেন, “যদি ট্রাম্পের এই হুমকিগুলো বাস্তব রূপ নেয়, তবে আমরা আমাদের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে দেশ রক্ষা করব। আমাদের এই ‘Retaliation’ বা পাল্টাহামলা হবে শত্রুর জন্য অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক। যারা আমাদের ওপর হামলায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহায়তা করবে, তারাও আমাদের লক্ষ্যবস্তু থেকে রেহাই পাবে না।”
সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
ইরানের অভ্যন্তরীণ সহিংস বিক্ষোভ ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ডনাল্ড ট্রাম্প যখন সামরিক পদক্ষেপের কথা বলছেন, তখন ইরান তার সামরিক শক্তির জানান দিচ্ছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী নাসিরজাদেহ দাবি করেছেন, গত জুন মাসে ইসরায়েলের সাথে সংঘটিত ১২ দিনের যুদ্ধে যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল, ইরান তা সফলভাবে কাটিয়ে উঠেছে। বর্তমানে দেশটির সামরিক উৎপাদন সক্ষমতা (Production Capacity) আগের চেয়ে অনেক বেশি এবং তারা যেকোনো দীর্ঘমেয়াদী সংঘাত মোকাবিলায় সক্ষম।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের কঠোর অবস্থান এবং ইরানের এই মারমুখী প্রতিক্রিয়া মধ্যপ্রাচ্যে একটি ‘Regional Escalation’ বা আঞ্চলিক সংঘাতের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে। ওয়াশিংটন এবং তেহরানের এই বাকযুদ্ধ যদি বাস্তবে রূপ নেয়, তবে তা বিশ্ব অর্থনীতি এবং জ্বালানি বাজারের ওপর এক প্রলয়ঙ্কারী প্রভাব ফেলতে পারে।