জনপ্রিয় গায়ক ও গীতিকার জুবিন গর্গের অকাল প্রয়াণ নিছকই দুর্ঘটনা নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো রহস্য? সিঙ্গাপুরে চলা তদন্তে বুধবার (১৪ জানুয়ারি) উঠে এল একাধিক চাঞ্চল্যকর তথ্য। আদালতের শুনানিতে তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মৃত্যুর আগে জুবিন গর্গের রক্তে উচ্চমাত্রায় অ্যালকোহল পাওয়া গিয়েছিল এবং তিনি লাইফ জ্যাকেট ছাড়াই সমুদ্রে নামার জেদ করেছিলেন। সিঙ্গাপুর পুলিশের দাবি অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত এই ঘটনায় কোনো ধরনের 'Foul Play' বা অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ইয়ট পার্টির সেই অভিশপ্ত বিকেল
৫২ বছর বয়সী জুবিন গর্গ গত বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর সিঙ্গাপুরের উপকূলে একটি ইয়ট পার্টিতে (Yacht Party) যোগ দিয়েছিলেন। পরদিন অর্থাৎ ২০ সেপ্টেম্বর সিঙ্গাপুরে আয়োজিত 'North East India Festival'-এ তার সংগীত পরিবেশন করার কথা ছিল। কিন্তু সেই অনুষ্ঠানের আগেই লাজারাস আইল্যান্ডের (Lazarus Island) কাছে সমুদ্রে ডুবে মৃত্যু হয় তার। প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান অনুযায়ী, দিনটি আনন্দের হলেও শেষ পর্যন্ত তা বিষাদে পরিণত হয়।
নিরাপত্তা বিধি উপেক্ষা ও লাইফ জ্যাকেট বিতর্ক
প্রধান তদন্তকারী কর্মকর্তা সিঙ্গাপুরের আদালতকে জানান, ইয়টটি যখন সমুদ্রের মাঝপথে ছিল, তখন জুবিন গর্গ একবার লাইফ জ্যাকেট পরে সাঁতার কাটতে নেমেছিলেন। কিছুক্ষণ পর তিনি ফিরে আসেন এবং জানান যে তিনি কিছুটা ক্লান্ত। তবে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়ার পর তিনি আবারও পানিতে নামার সিদ্ধান্ত নেন।
আদালতে পেশ করা তথ্যে জানা যায়, দ্বিতীয়বার পানিতে নামার সময় তাকে একটি ছোট আকারের লাইফ জ্যাকেট (Life Jacket) দেওয়া হলেও তিনি তা পরতে অস্বীকৃতি জানান। কোনো ধরনের নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়াই তিনি একা লাজারাস আইল্যান্ডের দিকে সাঁতার কাটতে শুরু করেন। ইয়টের ক্যাপ্টেন জানান, তিনি বারবার নিরাপত্তা সংক্রান্ত নির্দেশ (Safety Briefing) দিলেও গায়ক তা গ্রাহ্য করেননি।
টক্সিকোলজি রিপোর্টে চাঞ্চল্যকর তথ্য: রক্তে উচ্চমাত্রার অ্যালকোহল
জুবিন গর্গের মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটনে ফরেনসিক ও টক্সিকোলজি রিপোর্ট (Toxicology Report) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ফরেনসিক রিপোর্ট অনুযায়ী, তার রক্তে প্রতি ১০০ মিলিলিটারে অ্যালকোহলের মাত্রা ছিল ৩৩৩ মিলিগ্রাম। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায়, এই মাত্রার অ্যালকোহল শরীরে উপস্থিত থাকলে মানুষের বিচারবুদ্ধি, ভারসাম্য এবং তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানানোর ক্ষমতা (Motor Skills) মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইয়টের ক্যাপ্টেন আদালতকে জানিয়েছেন, জুবিন এতটাই মদ্যপ ছিলেন যে তিনি ঠিকমতো হাঁটতেও পারছিলেন না।
শারীরিক অসুস্থতা ও চিকিৎসা ইতিহাস
তদন্তে জুবিন গর্গের পুরনো চিকিৎসা ইতিহাসের (Medical History) বিষয়টিও সামনে এসেছে। তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানান, গায়কের দীর্ঘদিনের হাইপারটেনশন ও এপিলেপসি (Epilepsy) বা মৃগীরোগের সমস্যা ছিল। ২০২৪ সালের শুরুর দিকেও তার একবার বড় ধরনের খিঁচুনি হয়েছিল। তবে ঘটনার দিন তিনি নিয়মিত ওষুধ সেবন করেছিলেন কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ময়নাতদন্তের (Autopsy) রিপোর্টে মৃত্যুর কারণ হিসেবে 'পানিতে ডোবা' বা 'Drowning'-এর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। শরীরে যে সামান্য আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে, তা মূলত তাকে উদ্ধারের পর কার্ডিওপালমোনারি রিসাসিটেশন (CPR) দেওয়ার সময় তৈরি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অপরাধের প্রমাণ মেলেনি, তবে তদন্ত জারি ভারতেও
সিঙ্গাপুর পুলিশের পক্ষ থেকে আদালতে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে, এই মৃত্যুর পেছনে কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বা ফৌজদারি অপরাধের (Criminal Offense) প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে জুবিন গর্গের মৃত্যু নিয়ে ভারতে জল্পনা থামছে না। আসাম পুলিশের সিআইডি (CID) ইতোমধ্যেই রাজ্যজুড়ে দায়ের হওয়া ৬০টিরও বেশি এফআইআর-এর (FIR) ভিত্তিতে আলাদাভাবে তদন্ত শুরু করেছে। ভক্তদের একাংশের দাবি, এই মৃত্যুর পেছনে গভীর কোনো চক্রান্ত থাকতে পারে, যা খতিয়ে দেখছে ভারতের বিশেষ তদন্তকারী দল।