মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে (Geopolitics) যুদ্ধের দামামা বেজে উঠলেও শেষ মুহূর্তে খাদের কিনারা থেকে ফিরে এসেছে পরিস্থিতি। ইরানের ওপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সম্ভাব্য সামরিক হামলা রুখতে পর্দার আড়ালে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে সৌদি আরব, কাতার এবং ওমান। এক জ্যেষ্ঠ সৌদি কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এনেছে। মূলত এই অঞ্চলে একটি দীর্ঘমেয়াদী এবং ‘ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া’ এড়াতেই উপসাগরীয় তিন দেশ এই নজিরবিহীন কূটনৈতিক তৎপরতা চালায়।
পর্দার আড়ালে নজিরবিহীন ‘ম্যারাথন কূটনীতি’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই সৌদি কর্মকর্তা জানান, তেহরানের বিরুদ্ধে কঠোর সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ওয়াশিংটন যখন প্রায় প্রস্তুত, ঠিক তখনই রিয়াদ, দোহা এবং মাস্কাট যৌথভাবে একটি ‘শেষ মুহূর্তের উন্মত্ত কূটনৈতিক প্রচেষ্টা’ (Last-minute frantic diplomacy) শুরু করে। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে বোঝানো যে, ইরানকে সংঘাতের বদলে ‘সদিচ্ছা’ প্রদর্শনের একটি সুযোগ দেওয়া উচিত। দীর্ঘ আলোচনার পর ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত তার আক্রমণাত্মক অবস্থান থেকে সরে আসতে রাজি হন।
কেন পিছু হঠল ওয়াশিংটন?
সম্প্রতি ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের ওপর তেহরানের কঠোর দমন-পীড়নের জেরে ওয়াশিংটন দফায় দফায় হুঁশিয়ারি দিয়েছিল। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, বুধবার কাতারে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রধান সামরিক ঘাঁটি (US Military Base) থেকে বেশ কিছু কর্মীকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। একইসঙ্গে সৌদি আরব ও কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন মিশনগুলোতে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়।
মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছিল, বিক্ষোভকারীদের ওপর নির্যাতন অব্যাহত থাকলে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারে। পাল্টা জবাবে তেহরানও হুমকি দিয়েছিল যে, হামলা হলে তারা উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনা এবং যুদ্ধজাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করবে। এই পাল্টাপাল্টি হুমকির মুখে ওই অঞ্চলে একটি ‘আনকন্ট্রোল্ড সিচুয়েশন’ বা অনিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।
উপসাগরীয় দেশগুলোর উদ্বেগের কারণ
উপসাগরীয় অঞ্চলের অধিকাংশ দেশে মার্কিন সামরিক সম্পদ (US Assets) ও ঘাঁটি অবস্থিত। ইরানের ওপর কোনো ধরনের হামলা হলে ইরান তার প্রথম প্রতিশোধ এই দেশগুলোর ওপরই নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছিল। সৌদি কর্মকর্তা বলেন, “আমরা ওয়াশিংটনকে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছি, ইরানের ওপর আক্রমণ এই অঞ্চলে একের পর এক ভয়াবহ আঘাতের পথ খুলে দেবে, যা কারো জন্যই মঙ্গলজনক হবে না।”
অন্য এক উপসাগরীয় কর্মকর্তা জানান, ইরানকেও একটি কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছে। তেহরানকে জানানো হয়েছে যে, যদি তারা মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন স্থাপনাগুলোতে হামলা চালায়, তবে এই অঞ্চলের দেশগুলোর সাথে তাদের সম্পর্ক চিরতরে নষ্ট হয়ে যাবে এবং এর ফলাফল হবে সুদূরপ্রসারী।
বিক্ষোভ ও তেহরানের কৌশলগত নমনীয়তা
গত ডিসেম্বরে ইরানে দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দ্রুতই সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। সরকার এই বিক্ষোভ দমনে কঠোর অবস্থান নিলে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি হস্তক্ষেপের হুমকি দেয়। এক পর্যায়ে তেহরান বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ঘোষণা দিলেও ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি এবং মিত্র দেশগুলোর কূটনৈতিক চাপের মুখে সেই সিদ্ধান্ত থেকে আপাতত সরে এসেছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সম্প্রতি জানিয়েছেন যে, তিনি ‘অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র’ থেকে আশ্বাস পেয়েছেন যে ইরান বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করবে না। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ‘সূত্র’ আসলে সৌদি ও কাতারের মধ্যস্থতাকারীদের সেই মধ্যস্থতাই ছিল, যা যুদ্ধের উত্তেজনাকে সাময়িকভাবে হলেও প্রশমিত করেছে।
উত্তপ্ত এই ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সৌদি আরব, কাতার ও ওমানের এই সমন্বিত উদ্যোগকে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে একটি বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এই স্থিতিশীলতা কতদিন বজায় থাকে, তা নির্ভর করছে ওয়াশিংটন ও তেহরানের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।