ইরানে ছড়িয়ে পড়া নজিরবিহীন সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের মধ্যে এক কানাডীয় নাগরিকের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তেহরানের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ আরও ঘনীভূত হয়েছে। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) কানাডা সরকার এই মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে ইরানি কর্তৃপক্ষের চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
অটোয়ার কঠোর অবস্থান ও শোকবার্তা
কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী অনিতা আনন্দ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বার্তায় এই ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, “আমি অত্যন্ত দুঃখের সাথে জানতে পেরেছি যে, ইরানি কর্তৃপক্ষের হাতে সেখানে একজন কানাডীয় নাগরিক নিহত হয়েছেন। এটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক এবং অগ্রহণযোগ্য।”
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, নিহত ব্যক্তির নাম-পরিচয় গোপনীয়তা রক্ষার স্বার্থে এখনই প্রকাশ করা হচ্ছে না, তবে কানাডার কনস্যুলার (Consular) কর্মকর্তারা নিহতের পরিবারের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রাখছেন। কানাডা এই মৃত্যুর জন্য সরাসরি ইরানের শাসকগোষ্ঠীকে দায়ী করে বলেছে, সাধারণ মানুষের যৌক্তিক কণ্ঠস্বর দমনে তারা নির্লজ্জভাবে মানবজীবনের তোয়াক্কা করছে না।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্ষোভ: জি-৭ ও ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি
ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিশ্বের শীর্ষ ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোর জোট জি-৭ (G7)। জোটের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এক যৌথ বিবৃতিতে বিক্ষোভকারীদের ওপর ‘পরিকল্পিত সহিংসতা’ (Deliberate Violence) বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ইরান যদি মানবাধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন না করে এবং সংযম না দেখায়, তবে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে ‘অতিরিক্ত পদক্ষেপ’ নেওয়া হতে পারে।
এদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইরানের এই পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছেন। তার প্রশাসনের দাবি, ইরানি নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে এ পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষ হতাহত হয়েছেন। ট্রাম্প বারবার বিক্ষোভকারীদের পাশে থাকার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে তেহরানকে পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।
তেহরানের পাল্টা অভিযোগ
অন্যদিকে, অভ্যন্তরীণ এই অস্থিরতার জন্য পশ্চিমা দেশগুলোকেই দুষছে ইরান। দেশটির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের দাবি, এই বিক্ষোভের পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সরাসরি মদদ রয়েছে। তেহরানের মতে, বিদেশি শক্তির ইন্ধনেই দেশটিতে অস্থিতিশীলতা ও সন্ত্রাসবাদ ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে কানাডীয় নাগরিকের মৃত্যুর বিষয়ে তারা এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করেনি।
উত্তপ্ত ইরান: পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কা
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও রাজনৈতিক সংস্কারের দাবিতে ইরানে শুরু হওয়া বিক্ষোভ এখন একটি পূর্ণাঙ্গ সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। কানাডার নাগরিকের এই মৃত্যু এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কঠোর অবস্থান তেহরানকে নতুন করে বৈশ্বিক বিচ্ছিন্নতার (Global Isolation) মুখে ফেলতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে অটোয়া ও তেহরানের মধ্যে বিদ্যমান কূটনৈতিক টানাপোড়েন এই ঘটনার পর আরও জটিল রূপ নিতে পারে।