• ব্যবসায়
  • ভোক্তার স্বস্তিতে খামারির কান্না: উৎপাদন খরচের নিচে ডিম-মাংস বিক্রি, দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে টাঙ্গাইলের খামারিরা

ভোক্তার স্বস্তিতে খামারির কান্না: উৎপাদন খরচের নিচে ডিম-মাংস বিক্রি, দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে টাঙ্গাইলের খামারিরা

ব্যবসায় ১ মিনিট পড়া
ভোক্তার স্বস্তিতে খামারির কান্না: উৎপাদন খরচের নিচে ডিম-মাংস বিক্রি, দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে টাঙ্গাইলের খামারিরা

পোল্ট্রি ফিডের আকাশচুম্বী মূল্যে দিশেহারা প্রান্তিক খামারিরা; সরকারি ভর্তুকি ও স্থায়ী সমাধান না মিললে বন্ধ হয়ে যেতে পারে অবশিষ্ট খামারগুলোও।

ডিম ও মুরগির বাজারদরের নিম্নমুখী প্রবণতায় সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও মুদ্রার উল্টো পিঠ বলছে এক করুণ পরিণতির কথা। টাঙ্গাইলের প্রান্তিক খামারিরা এখন চরম অস্তিত্ব সংকটে। উৎপাদন খরচের (Production Cost) চেয়ে অনেক কম দামে ডিম ও মাংস বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ায় দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম হয়েছে শত শত খামারির। জেলার পোল্ট্রি শিল্পে এখন বিরাজ করছে এক নীরব হাহাকার।

খরচ ও বিক্রির বিশাল ব্যবধান: এক গাণিতিক লোকসান

গত প্রায় এক মাস ধরে বাজারে ডিম ও পোল্ট্রি মুরগির দাম স্থিতিশীল থাকলেও খামারিদের পিঠ ঠেকে গেছে দেয়ালে। টাঙ্গাইলের খামারিদের দাবি, পোল্ট্রি ফিড বা মুরগির খাবারের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় তাদের খরচ আর আয়ের মধ্যে কোনো ভারসাম্য নেই।

খামারিদের দেওয়া তথ্যমতে, এক বস্তা মুরগির খাদ্য কিনতে বর্তমানে খরচ হচ্ছে ২ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকা। অথচ বাজারে একটি ডিম বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র সাত টাকায়। পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি পিস ডিমে খামারিদের দুই টাকারও বেশি লোকসান হচ্ছে। গড়ে প্রতিটি খামারে প্রতিদিন প্রায় ৪ হাজার টাকা করে ক্ষতি গুনতে হচ্ছে মালিকদের। বর্তমানের এই ‘মার্কেট ভ্যালু’ (Market Value) খামারিদের টিকে থাকার সক্ষমতাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞের দাওয়াই: সরকারি ভর্তুকি ও বাজার নিয়ন্ত্রণ

পোল্ট্রি শিল্পের এই নাজুক অবস্থা নিয়ে কথা বলেছেন মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সঞ্জয় কুমার সাহা। তিনি মনে করেন, প্রান্তিক পর্যায়ের এই খাদ্য উৎপাদনকারীদের বাঁচাতে সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।

ড. সাহা বলেন, “প্রান্তিক চাষিদের উৎপাদন খরচের একটি বড় অংশ সরকারের ‘ভর্তুকি’ (Subsidy) হিসেবে বহন করা উচিত। উদাহরণস্বরূপ, যদি ১০ টাকা উৎপাদন খরচের মধ্যে সরকার ৩ টাকা ভর্তুকি দেয়, তবে খামারির প্রকৃত খরচ নেমে আসবে ৭ টাকায়। এতে খামারিরা যেমন দেউলিয়া হওয়া থেকে বাঁচবেন, তেমনি বাজারে ডিমের যোগান বৃদ্ধি পেয়ে প্রাইস স্ট্যাবিলিটি (Price Stability) নিশ্চিত হবে।”

অস্তিত্ব সংকটে টাঙ্গাইলের পোল্ট্রি শিল্প

খামারিদের পক্ষ থেকে প্রাপ্ত অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। গত দেড় দশকের ব্যবধানে নানা সংকটে জর্জরিত হয়ে টাঙ্গাইল জেলায় প্রায় ৮০ শতাংশ পোল্ট্রি খামার ইতিমধ্যেই বন্ধ হয়ে গেছে। যারা এখনো টিকে আছেন, তারা মূলত দেনার দায়ে জর্জরিত। পোল্ট্রি ফিডের সিন্ডিকেট এবং বাজারজাতকরণের সঠিক নীতিমালার অভাবেই এই সম্ভাবনাময় সেক্টরটি আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।

আশ্বাসের বাণী ও সরকারি পদক্ষেপ

খামারিদের এই সংকট সমাধানে আশার আলো দেখাচ্ছে জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। টাঙ্গাইল জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. হেলাল উদ্দিন খান জানান, তারা খামারিদের সমস্যাগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন এবং প্রয়োজনীয় কারিগরি ও প্রশাসনিক সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

তিনি আরও যোগ করেন, “এই সমস্যার একটি স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর কাজ করছে। বিষয়টি নিয়ে উচ্চপর্যায়ে আলোচনা চলছে এবং একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকের (Inter-ministerial Meeting) মাধ্যমে আসন্ন রোজার আগেই ডিম ও মাংসের উৎপাদন এবং বাজারমূল্যের মধ্যে একটি স্থায়ী ও যৌক্তিক সমাধান আসবে বলে আমরা আশা করছি।”

টাঙ্গাইলের খামারিদের দাবি, কেবল আশ্বাস নয় বরং দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপই পারে তাদের পথে বসা থেকে বাঁচাতে। অন্যথায় ‘সাপ্লাই চেইন’ (Supply Chain) ভেঙে পড়ে ভবিষ্যতে বাজারে আমিষের ঘাটতি ও আকাশচুম্বী দামের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

Tags: food security tangail news poultry farming egg price chicken production farm loss livestock department subsidy animal husbandry market crisis