ভারতের ঝাড়খণ্ডে এক পরিযায়ী শ্রমিকের (Migrant Worker) রহস্যজনক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) ভয়াবহ রণক্ষেত্রে পরিণত হয় পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার বেলডাঙা। দফায় দফায় সংঘর্ষ, পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর এবং জাতীয় সড়ক ও রেলপথ অবরোধে কার্যত স্তব্ধ হয়ে পড়ে বিস্তীর্ণ এলাকা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে ব্যাপক লাঠিচার্জ করতে হয়। এই উত্তাল পরিস্থিতিতে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে বিক্ষোভকারীদের নৃশংস হামলার শিকার হয়েছেন অন্তত চারজন সাংবাদিক।
রহস্যমৃত্যু না কি পরিকল্পিত হত্যা?
উত্তেজনার সূত্রপাত বেলডাঙার বাসিন্দা জনৈক আলাউদ্দিন শেখের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে। তিনি ঝাড়খণ্ডে ফেরিওয়ালার কাজ করতেন। শুক্রবার সকালে সেখানকার একটি ভাড়াবাড়ি থেকে তাঁর ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার হয়। ঝাড়খণ্ড পুলিশ প্রাথমিক তদন্তের পর বিষয়টিকে ‘আত্মহত্যা’ বলে দাবি করলেও নিহতের পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ ভিন্ন। তাঁদের দাবি, সংখ্যালঘু পরিচয়ের কারণে (Minority Identity) তাঁকে পিটিয়ে হত্যা করার পর মরদেহ ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই খবর বেলডাঙায় পৌঁছাতেই ক্ষোভে ফেটে পড়ে জনতা।
অবরোধে অচল যোগাযোগ ব্যবস্থা: ৩ ঘণ্টা চরম দুর্ভোগ
আলাউদ্দিনের মৃত্যুর বিচার চেয়ে সকাল থেকেই ১২ নম্বর জাতীয় সড়ক (National Highway 12) অবরোধ করেন কয়েক হাজার মানুষ। একই সঙ্গে বেলডাঙা স্টেশনে রেলপথও অবরুদ্ধ করা হয়। এর ফলে উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের মধ্যে সরাসরি সড়ক ও রেল যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। কয়েক ঘণ্টা ধরে চলা এই অবরোধের জেরে হাজার হাজার যাত্রী ট্রেন ও বাসে আটকে চরম দুর্ভোগের শিকার হন।
সহিংসতা ও সংবাদমাধ্যমের ওপর হামলা
বিক্ষোভের একপর্যায়ে পরিস্থিতি চরম সহিংস রূপ নেয়। উত্তেজিত জনতা রাস্তার ধারের ট্রাফিক কিয়স্ক (Traffic Kiosk) এবং পুলিশের গাড়িতে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গেলে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে খণ্ডযুদ্ধ বেধে যায়। ইটবৃষ্টির আঘাতে অন্তত ১২ জন আহত হন। এই সময় পেশাগত দায়িত্ব পালনরত চারজন সাংবাদিকের ওপর অতর্কিত হামলা চালায় উন্মত্ত জনতা। তাঁদের ক্যামেরা ও সরঞ্জাম ভাঙচুর করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
রাজনৈতিক চাপানউতোর ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ
ঘটনাটি কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। বিজেপির রাজ্য সভাপতি তথা কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার এই ঘটনার পেছনে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে বলেন, ‘তৃণমূল পরিকল্পিতভাবে সাম্প্রদায়িক অশান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে।’ অন্যদিকে, প্রদেশ কংগ্রেস নেতা অধীর চৌধুরী সাংবাদিকদের ওপর হামলার কড়া নিন্দা জানিয়ে বলেন, ‘সংবাদমাধ্যমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রশাসনের পবিত্র দায়িত্ব।’
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সাংবাদিকদের ওপর হামলার বিষয়ে কড়া সতর্কতা জারি করেছেন। তিনি বলেন, “কেউ যেন সাংবাদিকদের গায়ে হাত না দেন। তবে মবের (Mob) মধ্যে ঢুকে পড়লে অনেক সময় পরিস্থিতি সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে।”
ক্ষতিপূরণ ও বিশেষ কন্ট্রোলরুমের ঘোষণা
আন্দোলনকারীদের শান্ত করতে ও পরিস্থিতির মোকাবিলায় দ্রুত ময়দানে নামে জেলা প্রশাসন। মুর্শিদাবাদের জেলাশাসক (DM) নিতিন সিংহানিয়া জানিয়েছেন, নিহতের পরিবারকে উপযুক্ত আর্থিক সহায়তা এবং পরিবারের একজনকে চাকরির ব্যবস্থা করা হবে। এছাড়া, পশ্চিমবঙ্গের বাইরে কর্মরত পরিযায়ী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলায় ২৪ ঘণ্টার একটি বিশেষ ‘হেল্পলাইন কন্ট্রোলরুম’ (Control Room) চালু করার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে বেলডাঙার পরিস্থিতি থমথমে। পুনরায় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে এলাকায় বিশাল পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে এবং নিয়মিত রুট মার্চ (Route March) চালানো হচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষকে গুজবে কান না দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে।