• জাতীয়
  • মানব পাচারে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড: কঠোর আইন ও দ্রুত বিচার নিশ্চিতে নতুন অধ্যাদেশ জারি

মানব পাচারে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড: কঠোর আইন ও দ্রুত বিচার নিশ্চিতে নতুন অধ্যাদেশ জারি

জাতীয় ১ মিনিট পড়া
মানব পাচারে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড: কঠোর আইন ও দ্রুত বিচার নিশ্চিতে নতুন অধ্যাদেশ জারি

অভিবাসী চোরাচালান ও মানব পাচার রোধে অন্তর্বর্তী সরকারের ঐতিহাসিক পদক্ষেপ; ডিজিটাল মাধ্যমে বিজ্ঞাপন প্রচার এবং ভিকটিমের তথ্য প্রকাশেও রাখা হয়েছে কঠোর আইনি দণ্ড।

দেশের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিস্তৃত মানব পাচারের বিষবৃক্ষ উপড়ে ফেলতে অত্যন্ত কঠোর ও যুগোপযোগী আইন প্রণয়ন করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের মাধ্যমে পরিচালিত মানব পাচারের ঘটনায় এখন থেকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। একইসঙ্গে অবৈধভাবে অভিবাসী চোরাচালানের (Migrant Smuggling) দায়ে ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের কঠোর বিধান কার্যকর করা হয়েছে।

গত ৬ জানুয়ারি আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে এ সংক্রান্ত গেজেট (Gazette) জারির মাধ্যমে ‘মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ, দমন ও অধ্যাদেশ’ কার্যকর করা হয়েছে। এর মাধ্যমে পূর্বের ২০১২ সালের ‘মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন’ রহিত করা হলো।

সংঘবদ্ধ অপরাধে সর্বোচ্চ দণ্ড ও অভিবাসী চোরাচালান

নতুন অধ্যাদেশ অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তি বা সংঘবদ্ধ চক্র (Organized Crime Group) মানব পাচারের মতো জঘন্য অপরাধে লিপ্ত হয়, তবে অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনায় তাদের মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করা হবে। এছাড়া কেউ যদি স্বেচ্ছায় বা লাভবান হওয়ার উদ্দেশ্যে অভিবাসী চোরাচালান করার চেষ্টা করেন, তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অনধিক ১০ বছর কারাদণ্ডে দণ্ডিত হতে হবে। এই কঠোর অবস্থানটি মূলত আন্তর্জাতিক পাচারকারী সিন্ডিকেটগুলোর তৎপরতা বন্ধে একটি শক্তিশালী ‘ডিটায়ারেন্ট’ (Deterrent) হিসেবে কাজ করবে।

ডিজিটাল মাধ্যমে নজরদারি ও কঠোর সংজ্ঞা

বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে অনেক সময় পাচারের ফাঁদ পাতা হয়। অধ্যাদেশের ২০ ধারায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, অভিবাসী চোরাচালানের উদ্দেশ্যে যদি কোনো ব্যক্তি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম (Digital Platform) বা প্রচলিত কোনো মাধ্যমে বিজ্ঞাপন (Advertisement) প্রচার করেন, তবে তাকে অনধিক ৭ বছর কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।

অধ্যাদেশে ‘অভিবাসী চোরাচালানের’ একটি স্পষ্ট সংজ্ঞাও প্রদান করা হয়েছে। ফরেনার্স অ্যাক্ট (Foreigners Act) এবং সিটিজেনশিপ অ্যাক্ট (Citizenship Act) অনুযায়ী, কোনো বিদেশি নাগরিককে বাংলাদেশে অবৈধ প্রবেশ করানো কিংবা কোনো বাংলাদেশি নাগরিককে অন্য রাষ্ট্রে অবৈধভাবে পাঠানোর প্রক্রিয়াটি এখন থেকে সরাসরি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

ভিকটিমের গোপনীয়তা রক্ষা ও সংবাদমাধ্যমের দায়বদ্ধতা

পাচারের শিকার বা ভিকটিমদের সামাজিক মর্যাদা রক্ষা ও সুরক্ষায় আইনটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। অধ্যাদেশের ২১ ধারা অনুযায়ী, ট্রাইব্যুনালের অনুমতি ছাড়া মানব পাচার বা অভিবাসী চোরাচালানের শিকার কোনো ব্যক্তির নাম, ঠিকানা, ছবি বা অন্য কোনো পরিচয় সংবাদমাধ্যম (News Media), অনলাইন পোর্টাল কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায় (Social Media) প্রকাশ করা দণ্ডনীয় অপরাধ। এই নিয়ম লঙ্ঘন করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ৬ মাসের কারাদণ্ড বা ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রাখা হয়েছে।

তদন্ত ও বিচারের সময়সীমা: দ্রুত বিচার নিশ্চিতের অঙ্গীকার

বিচারের দীর্ঘসূত্রতা রোধে অধ্যাদেশটিতে নির্দিষ্ট টাইমলাইন (Timeline) নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।

তদন্ত: অভিযোগ দায়েরের ৯০ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে হবে। বিশেষ ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনাল আরও ৪৫ দিন সময় বৃদ্ধি করতে পারবে।

বিচার: অভিযোগ গঠনের (Charge Sheet) পর ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে বিচার সম্পন্ন করতে হবে।

ক্যামেরা ট্রায়াল: নারী ও শিশুদের নিরাপত্তার স্বার্থে প্রয়োজনে রুদ্ধদ্বার কক্ষে বা ‘ক্যামেরা ট্রায়াল’ (Camera Trial) পরিচালনার ক্ষমতা ট্রাইব্যুনালকে দেওয়া হয়েছে।

আপিল: ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে ৩০ দিনের মধ্যে হাইকোর্টে আপিল করার সুযোগ থাকবে।

মিথ্যা মামলার বিরুদ্ধে সুরক্ষা

আইনের অপব্যবহার রোধে এই অধ্যাদেশে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কাউকে হয়রানি বা ক্ষতিসাধনের উদ্দেশ্যে যদি কোনো ব্যক্তি মানব পাচারের মিথ্যা মামলা দায়ের করেন, তবে ওই ব্যক্তিকে অনধিক ৫ বছর কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। এর ফলে প্রকৃত ভুক্তভোগীদের বিচার পাওয়ার পথ আরও সুগম হবে বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।

Tags: interim government human trafficking death penalty migrant smuggling new law digital advertising victim protection legal reform court tribunal immigration crime