বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করে ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড দখলের ইস্যুতে এবার চরম কঠোর পদক্ষেপ নিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণে মার্কিন প্রস্তাবের বিরোধিতা করায় ইউরোপের আটটি মিত্র দেশের ওপর বড় অঙ্কের শুল্ক (Tariff) আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তে আটলান্টিক মহাসাগরের দুই পাড়ের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কে বড় ধরনের ফাটল ধরার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ফেব্রুয়ারি থেকেই কার্যকর হচ্ছে নতুন শুল্ক নীতি
স্থানীয় সময় শনিবার (১৭ জানুয়ারি) নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ (Truth Social) একটি পোস্টের মাধ্যমে এই কঠোর পদক্ষেপের কথা জানান ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন, ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, ফিনল্যান্ড এবং যুক্তরাজ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা সব ধরনের পণ্যের ওপর আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হবে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আরও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, যদি এই দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মেনে কোনো চুক্তিতে না আসে, তবে ১ জুন থেকে এই শুল্কের হার বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হবে। দীর্ঘমেয়াদী এই Economic Warfare বা অর্থনৈতিক যুদ্ধ ততক্ষণ চলবে, যতক্ষণ না দেশগুলো গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে মার্কিন আধিপত্য মেনে নেয়।
কেন গ্রিনল্যান্ড চান ট্রাম্প? ‘গোল্ডেন ডোম’ ও জাতীয় নিরাপত্তা
গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত গুরুত্বের কথা উল্লেখ করে ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের National Security বা জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে এই অঞ্চলটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে পরিকল্পিত মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘গোল্ডেন ডোম’ (Golden Dome) প্রকল্পের সার্থক বাস্তবায়নের জন্য গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
হোয়াইট হাউসে আয়োজিত এক বৈঠকে ট্রাম্প বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র প্রায় দেড়শো বছরেরও বেশি সময় ধরে গ্রিনল্যান্ড কেনার চেষ্টা করছে। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এটি আমাদের জন্য অপরিহার্য। এটি শুধু আমাদের নয়, কানাডার সুরক্ষার জন্যও প্রয়োজনীয়।” তিনি অভিযোগ করেন, ইউরোপীয় দেশগুলো গ্রিনল্যান্ডে ‘অজানা উদ্দেশ্যে’ প্রতিনিধি পাঠিয়ে এক বিপজ্জনক খেলায় (Dangerous Game) মেতেছে, যা মার্কিন স্বার্থের পরিপন্থী।
ইউরোপের কঠোর হুঁশিয়ারি ও সামরিক তৎপরতা
ট্রাম্পের এই একতরফা শুল্ক আরোপের ঘোষণার পর তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইউরোপীয় দেশগুলো। আট দেশের নেতারা এক যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছেন, শুল্কের ভয় দেখিয়ে ইউরোপকে তাদের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত থেকে বিচ্যুত করা যাবে না। ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে ইউরোপীয় ইউনিয়নও (EU) ঐক্যবদ্ধ ও সমন্বিতভাবে পাল্টা জবাব দেবে বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা এক বিবৃতিতে জানান, আন্তর্জাতিক আইন এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ভূখণ্ড রক্ষায় ইউরোপ বিন্দুমাত্র আপস করবে না। এদিকে, কূটনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই গ্রিনল্যান্ডে সামরিক শক্তি বাড়িয়েছে ইউরোপ। ডেনমার্কের অনুরোধে সাড়া দিয়ে জার্মানি ও অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের সীমিত সংখ্যক সেনা (Troop Deployment) ইতিমধ্যেই গ্রিনল্যান্ডে পৌঁছেছে।
উত্তপ্ত বৈশ্বিক রাজনীতি ও বাজার পরিস্থিতি
ট্রাম্পের এই শুল্ক ঘোষণার ফলে বিশ্ববাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও ফ্রান্সের মতো শক্তিশালী অর্থনীতির ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপিত হলে তা বিশ্ব বাণিজ্যে বড় ধরনের স্থবিরতা নিয়ে আসতে পারে। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিতে অনড় থেকে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে সমঝোতা না হওয়া পর্যন্ত পিছু হটবে না ওয়াশিংটন।
এখন দেখার বিষয়, এই শুল্ক যুদ্ধের হুমকি ইউরোপকে আলোচনার টেবিলে বাধ্য করে, নাকি ট্রান্স-আটলান্টিক জোটে এক দীর্ঘস্থায়ী ফাটল তৈরি করে।