ভারতের উত্তর প্রদেশের শিল্পনগরী গ্রেটার নয়ডায় এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ২৭ বছর বয়সী এক তরুণ সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার (Software Engineer)। শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) রাতে কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে নির্মাণাধীন রাস্তার ধারের একটি গভীর ড্রেনে গাড়ি ছিটকে পড়ে মৃত্যু হয় তার। তবে এই মৃত্যুকে ঘিরে তৈরি হয়েছে চরম বিতর্ক। নিহতের পরিবারের দাবি, প্রশাসনের উদাসীনতা এবং উদ্ধারকারী দলের অপেশাদারিত্বের কারণেই অকালে ঝরে গেছে একটি তাজা প্রাণ।
আটকে পড়া ছেলের শেষ ফোন কল
নিহত যুবরাজ মেহতা পেশায় একজন দক্ষ সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন এবং গুরুগ্রামের একটি নামী প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন। ঘটনার রাতে তিনি নিজে গাড়ি চালিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। দুর্ঘটনার ঠিক পরপরই তিনি তার বাবাকে ফোন করে আর্তনাদ করে বলেছিলেন, "বাবা, আমি আটকে গেছি। গাড়িটা ড্রেনের ভেতর পড়ে গেছে।" ছেলের সেই শেষ ফোন কল পেয়েই দুর্ঘটনাস্থলে ছুটে গিয়েছিলেন বাবা রাজ কুমার মেহতা। কিন্তু গিয়ে দেখেন, চোখের সামনেই যমে-মানুষে টানাটানি চলছে, অথচ তাকে বাঁচানোর মতো কেউ নেই।
উদ্ধার অভিযানে গাফিলতির গুরুতর অভিযোগ
ঘটনার ভয়াবহতা প্রকাশ পায় প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায়। প্রত্যক্ষদর্শী মনীন্দরের মতে, যুবরাজ প্রায় পৌনে দুই ঘণ্টা গাড়ির ভেতর জীবিত অবস্থায় আটকে ছিলেন। তিনি চিৎকার করে বলছিলেন, "দয়া করে আমাকে যেকোনোভাবে বাঁচান!" কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, পুলিশ এবং দমকল বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও তাদের কাছে কোনো প্রশিক্ষিত ডুবুরি বা সাতারু ছিল না।
নিহতের বন্ধু পঙ্কজ জানান, "উদ্ধারকারী দল রাত ২টা ৩০ মিনিটে পৌঁছালেও তারা ভোর ৩টা ২০ মিনিটের আগে পানিতে নামতে পারেনি।" রাজ কুমার মেহতা আক্ষেপ করে বলেন, "সেখানে যদি একজন সাতারু থাকত, তবে আমার ছেলেকে হয়তো জীবিত উদ্ধার করা যেত। জল অনেক গভীর ছিল, কিন্তু কারো কাছে ন্যূনতম প্রস্তুতি ছিল না।"
কীভাবে ঘটল এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা?
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, যুবরাজ একটি গ্র্যান্ড ভিটারা (Grand Vitara) গাড়ি চালাচ্ছিলেন। সেক্টর ১৫০-এর একটি নির্মাণাধীন এলাকার মোড় ঘোরার সময় তিনি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। সেখানে কোনো সুরক্ষা প্রাচীর বা সতর্কবার্তা ছিল না। ফলে গাড়িটি সরাসরি ৬-৭ ফুট চওড়া একটি বিশাল ড্রেনে গিয়ে পড়ে। দৃশ্যমানতা (Visibility) কম থাকা এবং গাড়ির গতি বেশি থাকাকে দুর্ঘটনার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে পুলিশ।
প্রশাসনের চরম অবহেলার শিকার
সহকারী পুলিশ কমিশনার হেমন্ত উপাধ্যায় জানান, ঘন কুয়াশা এবং রাস্তায় আলোর অভাব দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছিল। তবে এই ব্যাখ্যা মানতে নারাজ স্থানীয় বাসিন্দারা। যুবরাজের বাবার করা অভিযোগপত্র অনুযায়ী, সেক্টর ১৫০-এর বাসিন্দারা দীর্ঘ দিন ধরেই নয়ডা কর্তৃপক্ষের কাছে এই ড্রেনটির চারপাশে ব্যারিকেড (Barricade) এবং রিফ্লেক্টর (Reflector) লাগানোর অনুরোধ করে আসছিলেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো কর্ণপাত না করায় এই অরক্ষিত গর্তটি এখন মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে।
উদ্ধারকারীরা শেষ পর্যন্ত ভোর ৫টার দিকে যুবরাজের নিথর দেহটি উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। এই ঘটনাটি আধুনিক স্মার্ট সিটির নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং জরুরি উদ্ধার পরিষেবার কঙ্কালসার অবস্থাকেই ফের সামনে নিয়ে এসেছে।