টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না পাহাড়ের লাল মাটি চুরির মহোৎসব। একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে প্রতিনিয়ত উজাড় হচ্ছে সংরক্ষিত বনভূমি ও প্রাকৃতিক টিলা। পাহাড় কাটার ফলে একদিকে যেমন প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে বিপন্ন হয়ে পড়ছে স্থানীয় জীববৈচিত্র্য (Bio-diversity)। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জরিমানা ও অভিযান চালানো হলেও মাটি চোর চক্রের বেপরোয়া মনোভাব জনমনে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
বিপন্ন পরিবেশ ও মাফিয়া রাজত্বের বিস্তার
সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে দেখা গেছে, পাহাড়ি এলাকা হিসেবে পরিচিত গোড়াই, আজাগানা, তরফপুর, লতিফপুর ও বাঁশতৈল—এই পাঁচটি ইউনিয়নে মাটি চুরির প্রকোপ সবচেয়ে বেশি। চিহ্নিত একটি প্রভাবশালী মহল দিনের আলোতে যেমন, তেমনি রাতের আঁধারেও পাহাড়ের বুক চিরে মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই অবৈধ বাণিজ্যের মাধ্যমে চক্রটি প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। মাটির টিলাগুলো সমতল হয়ে যাওয়ায় বনভূমির গাছপালা ধ্বংস হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদী পরিবেশগত বিপর্যয় (Environmental Crisis) ডেকে আনছে।
অবকাঠামো ধ্বংস ও ডাম্প ট্রাকের দাপট
মাটি পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে ভারী ডাম্প ট্রাক (Dump Truck)। অতিরিক্ত ওজনের মাটি নিয়ে এই ট্রাকগুলো যাতায়াত করার ফলে গোড়াই-সখীপুর রোড, পেকুয়া-পাথরঘাটা রোড এবং হাঁটুভাঙ্গা-আজগানা রোডসহ অন্তত ২৫টি আঞ্চলিক সড়ক চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। গ্রামীণ অবকাঠামোর এই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধারণ মানুষের ভোগান্তিকে চরমে পৌঁছে দিয়েছে। অথচ সড়ক রক্ষণাবেক্ষণের কোনো উদ্যোগ বা দায়বদ্ধতা এই মাটি ব্যবসায়ীদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে না।
হুমকি ও রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ
মাটি কাটার প্রতিবাদ করতে গিয়ে প্রাণনাশের হুমকির মুখে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, বাধা দিলেই রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী নেতা কিংবা প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নাম ভাঙিয়ে ভয়ভীতি দেখানো হয়। এমনকি প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেওয়ার হুমকি দিয়ে মুখ বন্ধ রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। এই অপরাধী চক্রটি স্থানীয় পর্যায়ে এতটাই শক্তিশালী হয়ে উঠেছে যে, তারা এখন প্রকাশ্যেই তাদের কার্যক্রম (Illegal Excavation) চালিয়ে যাচ্ছে।
প্রশাসনের পদক্ষেপ ও আইনি অভিযান
বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা নিয়মিতভাবে অবৈধ মাটি কাটার বিরুদ্ধে কাজ করছেন। বাঁশতৈল রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. শাহীনুল ইসলাম এবং আজাগানা বিট কর্মকর্তা মো. সিরাজুল ইসলাম সিরাজ জানান, মাটি চুরির খবর পেলেই তারা স্থানীয় প্রশাসনকে অবহিত করেন এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানান।
মির্জাপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (UNO) সুরাইয়া ইয়াসমিন এ বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা ব্যক্ত করেছেন। তিনি জানান, পাহাড়ের লাল মাটি অবৈধভাবে কেটে নেওয়ার অপরাধে ইতিমধ্যে অনেকগুলো ডাম্প ট্রাক ও মাটি কাটার যন্ত্র (Excavator) জব্দ করা হয়েছে। গত কয়েক দিনে মোবাইল কোর্ট (Mobile Court) পরিচালনার মাধ্যমে অপরাধীদের কাছ থেকে প্রায় ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড আদায় করে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও হুঁশিয়ারি দেন যে, পাহাড়, নদী এবং ফসলি জমি রক্ষায় প্রশাসনের এই জিরো টলারেন্স নীতি ও অভিযান আগামীতে আরও জোরদার করা হবে।
পরিবেশবাদীরা মনে করছেন, কেবল আর্থিক জরিমানা করে এই ‘পাহাড় খেকো’ চক্রকে থামানো সম্ভব নয়। বনভূমি ও পাহাড় রক্ষায় স্থায়ী সমাধান পেতে হলে আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি জড়িত প্রভাবশালীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি।