স্পেনের দক্ষিণাঞ্চলে দুই দ্রুতগতির (High-speed) ট্রেনের ভয়াবহ সংঘর্ষে এক রক্তাক্ত ট্র্যাজেডি রচিত হয়েছে। কর্ডোবা প্রদেশের আদামুস এলাকায় ঘটা এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় এখন পর্যন্ত অন্তত ২১ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে বিপরীত দিক থেকে আসা অন্য একটি ট্রেনের ওপর আছড়ে পড়লে এই ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। স্থানীয় সময় রোববার (১৮ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় ঘটা এই দুর্ঘটনায় দ্বিতীয় ট্রেনটিও লাইনচ্যুত হয়ে পাশের গভীর খাদে পড়ে যায়।
সংঘর্ষের ভয়াবহতা ও প্রাথমিক বিবরণ
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও পুলিশ সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনাটি ঘটে মাদ্রিদ থেকে প্রায় ৩৬০ কিলোমিটার দক্ষিণে। রাজধানী মাদ্রিদ থেকে হুয়েলভাগামী একটি ট্রেনের সঙ্গে মালাগা থেকে মাদ্রিদগামী একটি বেসরকারি ‘Iryo’ ট্রেনের এই সংঘর্ষ ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ‘Iryo ৬১৮৯’ ট্রেনটি প্রথমে লাইনচ্যুত হয়ে পাশের ট্র্যাকে ছিটকে পড়ে। ঠিক সেই মুহূর্তেই বিপরীত দিক থেকে আসা ‘Alvia’ ট্রেনটি প্রায় ২০০ কিলোমিটার গতিতে (Speed) থাকায় ব্রেকিং সিস্টেম কার্যকর হওয়ার আগেই সংঘর্ষটি ঘটে। এতে ট্রেন দুটির একাধিক বগি দুমড়েমুচড়ে যায়।
উদ্ধার অভিযান ও হতাহতের চিত্র
স্পেনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে একজন ট্রেনের চালকও রয়েছেন। দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ১০০ জন, যাদের মধ্যে ২৫ জনের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। উদ্ধারকাজে নিয়োজিত জরুরি সেবা সংস্থাগুলো জানিয়েছে, দুর্ঘটনাস্থলটি অত্যন্ত দুর্গম এবং একটি ট্রেন প্রায় চার মিটার নিচে খাদের মধ্যে পড়ে থাকায় উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
আন্দালুসিয়ার আঞ্চলিক স্বাস্থ্য প্রধান আন্তোনিও সানজ এক বিবৃতিতে বলেন, “আমরা অত্যন্ত জটিল একটি রাত অতিবাহিত করছি। ধ্বংসস্তূপের ভেতরে এখনও অনেকে আটকে আছেন, তাই নিহতের সংখ্যা আরও বাড়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।” কর্ডোবার ফায়ার সার্ভিস প্রধান জানিয়েছেন, সংকীর্ণ জায়গায় আটকে পড়া যাত্রীদের বের করে আনাই এখন সবচাইতে বড় চ্যালেঞ্জ (Technical Challenge)।
রেল অবকাঠামো ও কারিগরি তদন্ত
স্পেনের পরিবহনমন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তে এই দুর্ঘটনাকে ‘অত্যন্ত অদ্ভুত’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি জানান, যে স্থানে ট্রেনটি লাইনচ্যুত হয়েছে, সেই ‘Infrastructure’ বা রেললাইন গত মে মাসেই সংস্কার করা হয়েছিল। রেল অবকাঠামো পরিচালনাকারী সংস্থা ‘Adif’ এবং বেসরকারি অপারেটর ‘Iryo’ (যাদের মালিকানা ইতালির রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত রেলগোষ্ঠীর হাতে) যৌথভাবে ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। প্রাথমিক তদন্তে দেখা হচ্ছে কোনো কারিগরি ত্রুটি বা ‘Signaling Failure’ ছিল কি না। জরুরি পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সকল ‘Standard Protocol’ সক্রিয় করা হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় শোক ও প্রশাসনিক তৎপরতা
এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের খবরে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ সোমবারের পূর্বনির্ধারিত সকল কর্মসূচি বাতিল করেছেন। তিনি ব্যক্তিগতভাবে উদ্ধার কার্যক্রম তদারকি করছেন। রাজপ্রাসাদ থেকে জানানো হয়েছে, রাজা ও রানি সার্বক্ষণিক পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছেন। উদ্ধারকাজে গতি আনতে পার্শ্ববর্তী সামরিক ঘাঁটি থেকে সেনা সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে।
দুর্ঘটনার পর মাদ্রিদ ও আন্দালুসিয়ার মধ্যে সব ধরনের রেল যোগাযোগ অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেছে কর্তৃপক্ষ। আদামুজ শহরে একটি অস্থায়ী সহায়তা কেন্দ্র খোলা হয়েছে, যেখানে স্থানীয় বাসিন্দারা আহত ও আতঙ্কিত যাত্রীদের জন্য খাদ্য ও প্রাথমিক চিকিৎসা সামগ্রী নিয়ে এগিয়ে এসেছেন।
স্পেনের ইতিহাসে অন্যতম এই ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনাটি দেশটির ‘High-speed rail’ নেটওয়ার্কের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। বিশেষ করে ২০০ কিমি গতির ট্রেনের সংঘর্ষে যে জানমালের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।