বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার বিষখালী নদীর বুক চিরে জেগে ওঠা এক বিচ্ছিন্ন জনপদ ‘মাঝেরচর’। কাকচিড়া ইউনিয়নের এই গ্রামে প্রায় ৫০০ পরিবারের বসবাস, যেখানে মোট জনসংখ্যা সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি। অথচ আধুনিক যুগে দাঁড়িয়েও এই বিশাল জনপদে নেই কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয় (Primary School)। ফলে কয়েক প্রজন্ম ধরে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে চরাঞ্চলের এই অবহেলিত জনপদের শিশুরা। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উত্তাল নদী পার হয়ে অন্য গ্রামে পড়াশোনা করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার আশঙ্কায় থাকে কয়েকশো খুদে প্রাণ।
বিষখালী নদীর উত্তাল ঢেউ ও শিশুদের শিক্ষা লড়াই
ভৌগোলিকভাবে মাঝেরচর গ্রামটি খরস্রোতা বিষখালী নদীর মাঝখানে অবস্থিত। বর্তমানে গ্রামে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ছয় শতাধিক। এর মধ্যে মাত্র শতাধিক শিশু বড় ট্রলার বা নৌকায় করে খেয়া পার হয়ে পাশের এলাকার স্কুলগুলোতে যাওয়ার সাহস দেখায়। বর্ষা মৌসুমে যখন নদীর পানির স্তর বৃদ্ধি পায় এবং ঝড়-তুফান শুরু হয়, তখন এই যাতায়াত চরম ‘লাইফ রিস্ক’ বা জীবনঝুঁকিতে পরিণত হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গ্রামে কোনো সরকারি বা বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় না থাকায় বাকি পাঁচশো শিশু কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই বড় হচ্ছে। নিরাপত্তার অভাবে অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে ভয় পাচ্ছেন, যার ফলে ওই এলাকায় ‘ড্রপআউট’ (Dropout) বা স্কুল থেকে ঝরে পড়ার হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।
অস্থায়ী প্রচেষ্টা ও বর্তমান শূন্যতা
গ্রামবাসীদের সূত্রে জানা গেছে, এর আগে একটি এনজিও (NGO) শিশুদের জন্য অস্থায়ীভাবে একটি পাঠদান কেন্দ্র চালু করেছিল। মাঝেমধ্যে একটি সাইক্লোন শেল্টারেও (Cyclone Shelter) পাঠদান চলত। কিন্তু বর্তমানে সেসব কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে গ্রামে শিক্ষার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পরিকাঠামো বা ‘ইনফ্রাস্ট্রাকচার’ অবশিষ্ট নেই। শিক্ষার অভাবে অনেক শিশু অল্প বয়সেই পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে পরিবারের সঙ্গে মাছ ধরা বা কৃষিকাজে যুক্ত হয়ে পড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে ওই অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
অভিভাবকদের আর্তি ও নিরাপত্তা শঙ্কা
৬ ও ৮ বছরের দুই সন্তানের বাবা নিজাম উদ্দিন মিয়া তাঁর গভীর উদ্বেগের কথা জানিয়ে বলেন, “আমার দুই সন্তান প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ে। কিন্তু প্রতিদিন যখন ওরা নৌকায় করে নদী পার হয়, ততক্ষণ আমি আর তাদের মা বাড়িতে দুশ্চিন্তায় থাকি। নদীর স্রোত যেভাবে বাড়ছে, তাতে যে কোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। আমাদের মাঝেরচরে যদি একটি স্কুল থাকত, তবে আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ এভাবে অনিশ্চিত হতো না।”
প্রশাসনের আশ্বাস: দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি
মাঝেরচরের এই চরম অব্যবস্থাপনার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে পাথরঘাটা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জিনাত জাহান বিস্ময় প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “আমি এই কর্মস্থলে নতুন যোগদান করেছি। এত বিশাল একটি জনপদে কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই, বিষয়টি আমার নজরে ছিল না। আমি দ্রুত এলাকাটি পরিদর্শন করে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে প্রতিবেদন জমা দেব এবং বিদ্যালয় স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেব।”
অন্যদিকে, পাথরঘাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (UNO) ইশরাত জাহান বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন। তিনি জানান, কয়েক হাজার মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা প্রশাসনের অগ্রাধিকার। যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া শেষ করে সেখানে একটি স্থায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের জন্য সরকারি প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।
একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে যেখানে ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা বলা হচ্ছে, সেখানে একটি আস্ত গ্রামের শত শত শিশুর পড়াশোনার জন্য নদী পারাপার হওয়া এক করুণ বাস্তবতা। স্থানীয়দের দাবি, সরকার যেন অবিলম্বে এই দুর্গম চরাঞ্চলে শিক্ষা অবকাঠামো গড়ে তুলে কয়েক হাজার মানুষের সন্তানদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করে।