পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় কাশ্মীর এবং গিলগিট-বালতিস্তান অঞ্চলে সোমবার (১৯ জানুয়ারি) আঘাত হেনেছে শক্তিশালী এক ভূমিকম্প। রিখটার স্কেলে ৬ মাত্রার (Magnitude) এই কম্পনে বিধ্বস্ত হয়েছে অসংখ্য ঘরবাড়ি। প্রাকৃতিক এই বিপর্যয়ে পাহাড় থেকে পাথর গড়িয়ে পড়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন আরও বেশ কয়েকজন। এই শক্তিশালী ভূ-কম্পন পাকিস্তান ছাড়িয়ে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর কিছু অংশেও অনুভূত হয়েছে বলে জানা গেছে।
ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ও তীব্রতা
ইউরোপিয়ান-মেডিটেরেনিয়ান সিসমোলজিক্যাল সেন্টার (EMSC) জানিয়েছে, এই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার গভীরে। শক্তিশালী এই কম্পন অনুভূত হওয়ার পরপরই পাহাড়ি জনপদগুলোতে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপত্তার আশায় খোলা জায়গায় বেরিয়ে আসে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অগভীর উৎপত্তিস্থল হওয়ার কারণেই কম্পনের তীব্রতা ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেশি হয়েছে।
ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে বসতভিটা
আঞ্চলিক তথ্যমন্ত্রী গোলাম আব্বাস সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, গিলগিট-বালতিস্তান প্রদেশের বেশ কিছু এলাকায় মাটির তৈরি এবং পুরনো ঘরবাড়ি ভূমিকম্পের ধাক্কা সইতে না পেরে ধসে পড়েছে। অনেক পাকা বাড়িতেও বড় ধরনের ফাটল দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে দুর্গম পাহাড়ি গ্রামগুলোতে ক্ষয়ক্ষতি সবচেয়ে বেশি হয়েছে। সরকারি হিসেবে অনেক পরিবার এখন বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়েছে এবং প্রচণ্ড শীতের মধ্যে খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছে।
ভূমিধস ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিপর্যয়
ভূমিকম্পের ফলে সৃষ্ট কম্পনে পাহাড়ের ঢাল থেকে বড় বড় পাথর ও মাটি ধসে পড়ার (Landslide) ঘটনা ঘটেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধসে পড়া পাথরের আঘাতেই ওই ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে, যখন তিনি রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন। এই ভূমিধসের কারণে ওই অঞ্চলের প্রধান মহাসড়ক এবং বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ সড়ক অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। ফলে উপদ্রুত এলাকাগুলোর সাথে প্রশাসনিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, যা উদ্ধারকাজকে আরও চ্যালেঞ্জিং করে তুলেছে।
উদ্ধার তৎপরতা ও সরকারি পদক্ষেপ
বর্তমানে বর্ডার রোডস অর্গানাইজেশন এবং স্থানীয় উদ্ধারকারী দলগুলো ভারী যন্ত্রপাতি (Heavy Machinery) নিয়ে সড়ক পরিষ্কারের কাজ শুরু করেছে। তবে প্রতিকূল আবহাওয়া এবং ভূ-প্রাকৃতিক গঠনের কারণে উদ্ধার তৎপরতা কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে। পাকিস্তান সরকার ইতোমধ্যে দুর্গতদের জন্য জরুরি ত্রাণ সহায়তা, অস্থায়ী তাবু এবং প্রয়োজনীয় ঔষধ পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন দুর্গম এলাকার ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ বিবরণ সংগ্রহের চেষ্টা চালাচ্ছে।
ভৌগোলিক প্রেক্ষাপট ও ঝুঁকি
পাকিস্তান এবং তৎসংলগ্ন হিমালয় অঞ্চলটি ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল এলাকায় অবস্থিত। ভারতীয় এবং ইউরেশীয় টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় এই অঞ্চলে প্রায়ই মাঝারি থেকে শক্তিশালী ভূমিকম্প অনুভূত হয়। ২০০৫ সালের বিধ্বংসী ভূমিকম্পের স্মৃতি এখনও এই অঞ্চলের মানুষের মনে দগদগে। সোমবারের এই কম্পন আবারও প্রমাণ করল যে, এই অঞ্চলের অবকাঠামো (Infrastructure) ভূমিকম্প মোকাবিলার জন্য এখনও কতটা ঝুঁকিপূর্ণ।