কক্সবাজারের উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ফের এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের (Fire Incident) ঘটনায় মানবিক বিপর্যয় নেমে এসেছে। সোমবার (১৯ জানুয়ারি) মধ্যরাতে উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের শফিউল্লাহ কাটা ১৬ নম্বর ক্যাম্পে এই বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ড ঘটে। আগুনের লেলিহান শিখায় মুহূর্তেই ভস্মীভূত হয়ে গেছে প্রায় ৫০০টি ঘর। ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিটের দীর্ঘ সাড়ে চার ঘণ্টার প্রাণপণ প্রচেষ্টায় মঙ্গলবার সকালে আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও ততক্ষণে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন কয়েক হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী।
ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ও ফায়ার সার্ভিসের তৎপড়তা
স্থানীয় ও ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, সোমবার দিবাগত রাত ৩টা ২০ মিনিটের দিকে ক্যাম্পের ডি-৪ ব্লকে আগুনের সূত্রপাত হয়। মুহূর্তের মধ্যেই দাহ্য পদার্থ ও বাঁশ-ত্রিপলের তৈরি ঘরগুলোতে আগুন ছড়িয়ে পড়ে এবং তা ভয়াবহ আকার ধারণ করে। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় উখিয়া ও রোহিঙ্গা ক্যাম্পের জন্য নিয়োজিত ফায়ার সার্ভিসের বিশেষ টিম।
কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের সিনিয়র স্টেশন অফিসার দোলন আচার্য্য জানান, আগুনের তীব্রতা বেশি হওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে কক্সবাজার সদর, টেকনাফ ও রামু স্টেশন থেকে আরও ৬টি ইউনিটকে মোতায়েন করা হয়। মোট ১০টি ইউনিটের মধ্যে ৮টি ইউনিট সরাসরি সম্মুখভাগে অংশ নিয়ে চারদিক থেকে আগুন ঘেরাও করে ফেলে। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর সকাল ৭টা ৫০ মিনিটে আগুন পুরোপুরি নির্বাপণ করা সম্ভব হয়।
উৎপত্তি নিয়ে ধোঁয়াশা ও এনজিও লার্নিং সেন্টার
প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, ১৬ নম্বর ক্যাম্পের ডি-৪ ব্লকে একটি এনজিও (NGO) পরিচালিত শিখন কেন্দ্র বা ‘লার্নিং সেন্টার’ (Learning Center) থেকে প্রথম আগুনের সূত্রপাত হয়। তবে ওই কেন্দ্রে কীভাবে আগুন লাগল, তা নিয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। বাসিন্দাদের দাবি, শিখন কেন্দ্রটি থেকে শুরু হওয়া আগুন দ্রুত পার্শ্ববর্তী শেডগুলোতে ছড়িয়ে পড়লে সাধারণ শরণার্থীরা জীবন বাঁচাতে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে অগ্নিকাণ্ডের সঠিক কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত শুরু হয়েছে।
ক্ষয়ক্ষতি ও মানবিক পরিস্থিতি
অগ্নিকাণ্ডে প্রায় ৫০০ বসতি সম্পূর্ণ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে বলে নিশ্চিত করেছে ফায়ার সার্ভিস। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, এখন পর্যন্ত এই ঘটনায় কোনো নিহতের (Casualty) সংবাদ পাওয়া যায়নি। ঘর হারিয়ে হাজারো মানুষ এখন নিঃস্ব অবস্থায় শীতের রাতে খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছেন। তাদের খাদ্য, চিকিৎসা ও জরুরি আশ্রয়ের জন্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা ও স্থানীয় প্রশাসন কাজ শুরু করেছে।
বারবার কেন অগ্নিকাণ্ড? বাড়ছে উদ্বেগ
রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে ঘনঘন আগুনের ঘটনা এখন বড় ধরনের নিরাপত্তা উদ্বেগের (Security Concern) কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর আগে গত বছরের ২৫ ও ২৬ ডিসেম্বর যথাক্রমে কুতুপালং নিবন্ধিত ক্যাম্প এবং ৪ নম্বর ক্যাম্পের হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল। একের পর এক অগ্নিকাণ্ড কি স্রেফ দুর্ঘটনা নাকি এর পেছনে কোনো নাশকতামূলক পরিকল্পনা রয়েছে, তা নিয়ে স্থানীয় সচেতন মহল ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
ক্যাম্পের ঘনবসতিপূর্ণ অবকাঠামো এবং অতি দাহ্য উপাদানের ব্যবহার আগুনের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এই পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে ফায়ার সেফটি প্রটোকল জোরদার করা এবং ড্রিলিং কার্যক্রম বাড়ানোর দাবি জোরালো হচ্ছে।