গণতান্ত্রিক রূপান্তর ও স্থিতিশীলতার চ্যালেঞ্জ
সম্মেলনে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী শাসনের পর বাংলাদেশ এখন একটি সংবেদনশীল গণতান্ত্রিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তাঁর মতে, এই পরিস্থিতিতে আসন্ন নির্বাচন কেবল একটি রাজনৈতিক আয়োজন নয়, বরং ১৮ কোটির বেশি মানুষের দেশের জন্য শাসনব্যবস্থার নতুন দিকনির্দেশনা নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।
জামায়াত আমির উল্লেখ করেন, বর্তমানে দেশের সামনে টিকে থাকা নয়, বরং স্থিতিশীলতাই বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি সমাজের নানা সমস্যার কথা তুলে ধরেন। যেমন, শিক্ষিত তরুণেরা তাঁদের শিক্ষা অনুযায়ী কাজ খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছেন এবং নারীরা এখনও বিভিন্ন কাঠামোগত বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, প্রতিনিয়ত কঠোর পরিশ্রম করেও কোটি কোটি মানুষ সামান্য সংকটের মুখে দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়ছেন।
অর্থনৈতিক ভাবনা ও প্রবাসীদের ভূমিকা
শফিকুর রহমান বলেন, এই বাস্তবতাগুলো সৎভাবে মোকাবিলা করা আবশ্যক। তাঁর মতে, শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিই সাফল্যের একমাত্র মানদণ্ড হতে পারে না। অর্থনৈতিক সাফল্য এমন হওয়া উচিত, যাতে নাগরিকেরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জীবন পরিকল্পনা করতে পারে, মর্যাদার সঙ্গে পরিবার পরিচালনা করতে পারে এবং সমাজে অর্থবহভাবে অংশ নিতে পারে।
তিনি প্রবাসী শ্রমিকদের অবদানকে বিশেষভাবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দেশের বাইরে কর্মরত লাখো শ্রমিক তাঁদের শ্রম ও ত্যাগের মাধ্যমে গভীর দেশপ্রেমের পরিচয় দিচ্ছেন। তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স শুধু পরিবারকেই সহায়তা করছে না, বরং দেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখছে এবং বাংলাদেশকে বৈশ্বিক শ্রমবাজারের সঙ্গে যুক্ত করছে। প্রবাসী শ্রমিকদের অবদান কেবল অর্থেই সীমাবদ্ধ নয়, তাঁরা দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও বৈশ্বিক জ্ঞান নিয়ে দেশে আরও বড় ভূমিকা রাখতে আগ্রহী।
এছাড়াও, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশি পেশাজীবী—শিক্ষাবিদ, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, উদ্যোক্তারা—আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তাঁদের অনেকেই দেশের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত এবং প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, নতুন প্রজন্মকে পরামর্শ দেওয়া ও সংস্কারে সহায়তা করতে প্রস্তুত।
কর্মসংস্থান ও বৃহত্তর অংশীদারত্ব
অর্থনৈতিক চিন্তায় পরিবর্তন আনার ওপর জোর দিয়ে জামায়াত আমির বলেন, কর্মসংস্থানকে কেবল বিনিয়োগের পার্শ্বফল হিসেবে বিবেচনা না করে এটিকে একটি রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার হিসেবে গণ্য করতে হবে। সেই সঙ্গে, ধীরে ধীরে অনানুষ্ঠানিক শ্রমকে আনুষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় আনার প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে।
শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র ও নাগরিক, সরকারি ও বেসরকারি খাত এবং বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যকার অংশীদারত্বের ওপর নির্ভর করবে। তিনি এই সম্মেলনে সম্পৃক্ততা, সহযোগিতা ও যৌথ দায়িত্ববোধের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
নারীর অংশগ্রহণ ও কাঠামোগত সংস্কার
সম্মেলনে জামায়াত আমির বাংলাদেশের ভবিষ্যতে নারীর ভূমিকাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো কেবল ন্যায়ের প্রশ্ন নয়, এটি একটি অর্থনৈতিক প্রয়োজন। কারণ জনসংখ্যার অর্ধেককে পূর্ণাঙ্গভাবে অন্তর্ভুক্ত না করে কোনো দেশই টেকসই সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারে না।
উল্লেখ্য, জামায়াত আয়োজিত এই সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত ও পাকিস্তানসহ মোট ৩০টি দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নিয়েছেন বলে আয়োজকেরা নিশ্চিত করেছেন।