রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশানের কালাচাঁদপুরে তরুণী সাদিয়া রহমান মীম হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহতা দেখে খোদ তদন্তকারী কর্মকর্তারা বিস্মিত। প্রাথমিক আলামত ও মরদেহের সুরতহাল রিপোর্ট বিশ্লেষণ করে পুলিশ বলছে, এটি কেবল একটি সাধারণ হত্যাকাণ্ড নয়; বরং ঘাতকের চরম আক্রোশ ও দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের এক বীভৎস বহিঃপ্রকাশ। খুনি মীমকে শুধু প্রাণেই মারতে চায়নি, বরং মৃত্যুর আগে তাকে চরম শারীরিক যন্ত্রণা দিতে চেয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিস্ময়কর নৃশংসতা ও ফরেনসিক আলামত
গত শনিবার রাতে কালাচাঁদপুরের একটি ফ্ল্যাট থেকে সাদিয়ার গলাকাটা ও ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করে গুলশান থানা পুলিশ। মীম পেশায় একজন ‘Bar Dancer’ ছিলেন। নিহতের শরীরে ২০টিরও বেশি গভীর ক্ষতচিহ্ন পাওয়া গেছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সাদিয়ার নাভির ওপর থেকে মুখমণ্ডল পর্যন্ত অন্তত ২০টি গভীর আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ঘাতক ঘরে থাকা সাধারণ ফল কাটার চাকু (Kitchen Knife) ব্যবহার করেই এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে। নিহতের শরীরের ক্ষতগুলোর গভীরতা দেখে বোঝা যাচ্ছে, খুনি অত্যন্ত উন্মত্ত অবস্থায় মীমকে উপর্যুপরি আঘাত করেছিল।
তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে ‘পরিচিত মহল’
গুলশান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাকিবুল হাসান ঘটনার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, “হত্যাকাণ্ডের ধরন বা ‘Modus Operandi’ দেখে মনে হচ্ছে এটি কোনো অপরিচিত বা আগন্তুকের কাজ নয়। মীম তার অত্যন্ত পরিচিত কারো চরম আক্রোশের শিকার হয়েছেন। বাসার ভেতর ঢুকে এমন নৃশংস হামলা চালিয়ে অনায়াসে পালিয়ে যাওয়া কোনো অপেশাদার অপরাধীর পক্ষে সম্ভব নয়।”
পুলিশের ধারণা, খুনি সাদিয়ার পূর্বপরিচিত এবং তার গতিবিধি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত ছিলেন। রহস্য উন্মোচনে পুলিশ নিহতের রুমমেট নুসরাত, নুসরাতের বন্ধু লিজা, রাব্বি ও মুরাদসহ মোট ছয়জনকে হেফাজতে নিয়ে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে। গোয়েন্দা তথ্যের পাশাপাশি ঘটনাস্থলের ‘CCTV Footage’ এবং ডিজিটাল এভিডেন্স (Digital Evidence) সংগ্রহ করে ঘাতককে শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।
সম্ভাব্য মোটিভ: পেশা, প্রেম না কি অর্থ?
তদন্তকারীরা এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে তিনটি প্রধান কারণকে সামনে রেখে কাজ করছেন— ১. পেশাগত দ্বন্দ্ব: বার ড্যান্সার হিসেবে কাজ করার সুবাদে কারো সাথে পেশাগত কোনো বিরোধ তৈরি হয়েছিল কি না। ২. প্রেমঘটিত জটিলতা: একাধিক প্রেমের সম্পর্ক বা প্রাক্তন কোনো প্রেমিকের প্রতিশোধ নেওয়ার নেশা। ৩. আর্থিক লেনদেন: বড় অঙ্কের কোনো পাওনা বা আর্থিক বিরোধের জের ধরে এই হত্যাকাণ্ড।
বিচারের দাবিতে পরিবার
নিহত মীমের বড় বোন শাহিদা আক্তার বাদী হয়ে গুলশান থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। শোকাতুর কণ্ঠে তিনি বলেন, “আমার বোনের সাথে কারো বড় কোনো শত্রুতা ছিল বলে কখনো শুনিনি। কিন্তু যারা তাকে এতটা নৃশংসভাবে মারলো, তারা মানুষ হতে পারে না। আমি আমার বোনের খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।”
মরদেহ বর্তমানে ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালের মর্গে রয়েছে। পুলিশ এখন পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ‘Murder Weapon’ বা ধারালো অস্ত্রটি উদ্ধার করতে পারেনি। তবে পুলিশ কর্মকর্তাদের দাবি, খুব শীঘ্রই এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মূল হোতাকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে। গুলশানের মতো সুরক্ষিত এলাকায় এমন রোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড সাধারণ মানুষের মধ্যেও এক ধরনের নিরাপত্তা শঙ্কা তৈরি করেছে।