• দেশজুড়ে
  • পটুয়াখালীতে আমনের ‘বাম্পার’ ফলন, কিন্তু কৃষকের হাসিতে নেই স্বস্তি: উৎপাদন খরচের চাপে দিশেহারা উপকূলের চাষি

পটুয়াখালীতে আমনের ‘বাম্পার’ ফলন, কিন্তু কৃষকের হাসিতে নেই স্বস্তি: উৎপাদন খরচের চাপে দিশেহারা উপকূলের চাষি

দেশজুড়ে ১ মিনিট পড়া
পটুয়াখালীতে আমনের ‘বাম্পার’ ফলন, কিন্তু কৃষকের হাসিতে নেই স্বস্তি: উৎপাদন খরচের চাপে দিশেহারা উপকূলের চাষি

উপকূলের মাঠে সোনালি আমনের সমারোহে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেলেও সার, বীজ ও শ্রমিকের উচ্চমূল্যে ম্লান হচ্ছে সাফল্যের রঙ; মধ্যস্বত্বভোগীদের সিন্ডিকেটে ন্যায্যমূল্য বঞ্চিত প্রান্তিক কৃষক।

পটুয়াখালী: পটুয়াখালীর দিগন্তজোড়া মাঠে এখন সোনালি আমন ধানের মৌ মৌ গন্ধ। অনুকূল আবহাওয়া আর কৃষকের হাড়ভাঙা পরিশ্রমে পটুয়াখালী জেলার আটটি উপজেলাতেই এবার আমন ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। তবে মাঠজুড়ে ধানের এই চমৎকার ফলনও হাসি ফোটাতে পারছে না প্রান্তিক চাষিদের মুখে। কৃষি উপকরণের আকাশচুম্বী দাম এবং শ্রমিকের চড়া মজুরিতে আমনের ‘বাম্পার’ সাফল্য এখন কৃষকের জন্য কেবলই এক গাণিতিক সান্ত্বনা।

উৎপাদন খরচের ভারে নুইয়ে পড়া কৃষি অর্থনীতি

দীর্ঘ দুই যুগ ধরে পটুয়াখালী জেলায় আমনের ধারাবাহিক ভালো ফলন হয়ে আসছে। তবে চলতি মৌসুমে পরিস্থিতি ভিন্ন। কৃষকদের অভিযোগ, ধানের উৎপাদন বাড়লেও তাদের Profit Margin বা নিট মুনাফা এখন তলানিতে। গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রতি বস্তা ইউরিয়া সারের দাম যেখানে ছিল ১ হাজার ১০০ টাকা, এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩৫০ টাকায়। এর সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে উন্নত মানের বীজ, কীটনাশক এবং শ্রমিকের খরচ।

সদর উপজেলার কয়েকজন কৃষক জানান, “সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাঠে খাটুনির পর হিসাব কষে দেখা যাচ্ছে, সব খরচ দিয়ে ঘরে কিছুই থাকছে না। ধানের ফলন দেখে চোখ জুড়ালেও পকেটের অবস্থা শূন্য।”

বাজার সিন্ডিকেট ও ন্যায্যমূল্যের সংকট

বর্তমানে পটুয়াখালীর স্থানীয় বাজারে প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০ টাকায়। কৃষকদের দাবি, পাইকার ও একদল অসাধু মধ্যস্বত্বভোগীর (Middlemen) কারসাজির কারণে বাজারে ধানের দাম স্থিতিশীল থাকছে না। ফলস্বরূপ, উৎপাদন খরচ তোলা তো দূরের কথা, সারা বছরের সংসার চালানো এবং সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ মেটাতেও হিমশিম খাচ্ছেন তারা।

কৃষকদের ভাষ্যমতে, বাজারে ধানের Supply পর্যাপ্ত থাকলেও পরিকল্পিতভাবে দাম কমিয়ে রাখা হচ্ছে। মাঠ পর্যায়ে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হওয়ায় এই বিপুল পরিমাণ উৎপাদনের সুফল চলে যাচ্ছে সিন্ডিকেটের পকেটে।

পরিসংখ্যানে আমনের সাফল্য

পটুয়াখালী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলায় মোট ১ লাখ ৮৯ হাজার ৮৩৮ হেক্টর জমিতে আমন ধানের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৮৪ হাজার মেট্রিক টন, যার আনুমানিক Market Value বা বাজারমূল্য প্রায় ২ হাজার ৫৯৯ কোটি টাকা। কৃষি বিভাগের দাবি, এবার লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও উৎপাদন বেশি হয়েছে।

পটুয়াখালী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ ড. মোহাম্মদ আমানুল ইসলাম বলেন, “আমরা মাঠ পর্যায়ে ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে এবং কৃষকদের সহায়তা দিতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছি। ফলন আশাতীত ভালো হয়েছে, যা আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য ইতিবাচক।”

টেকসই সমাধানের প্রত্যাশা

সার ডিলারদের মতে, ইউরিয়া সারের দাম বাড়লেও অন্যান্য সারের দাম স্থিতিশীল রয়েছে। তবে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিরা বলছেন, কৃষি উপকরণের ওপর সরকারি Subsidy বা ভর্তুকি না বাড়ালে এবং ধান ক্রয়ের ক্ষেত্রে সরাসরি সরকারি সংগ্রহ অভিযান জোরদার না করলে উপকূলের কৃষি খাত বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে।

কৃষি বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সুসংহত Supply Chain ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে উৎপাদন খরচ কমাতে পারলে পটুয়াখালীর কৃষকরা আবারও লাভের মুখ দেখতে পাবেন। অন্যথায়, বাম্পার ফলন কেবল সরকারি নথিতেই সাফল্যের গল্প হয়ে থাকবে, কৃষকের জীবনে তা কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে না।

Tags: bangladesh economy patuakhali news rural livelihood aman paddy bumper harvest agriculture cost farmer crisis fertilizer price rice market coastal agriculture