রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের ওপর সরাসরি আঘাত
জঙ্গল সলিমপুর এলাকাটি দীর্ঘ চার দশক ধরে কার্যত রাষ্ট্রের জন্য এক ধরনের ‘নো-গো এরিয়া’ হিসেবে পরিচিত। পাহাড় কেটে অবৈধ বসতি স্থাপন, ভূমিদস্যুদের দখল-বাণিজ্য, সশস্ত্র পাহারা এবং পরিচয়পত্র ছাড়া প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকার কারণে এখানে একটি সমান্তরাল শাসনব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। অতীতেও এই অঞ্চলে পুলিশ, জেলা প্রশাসন ও সাংবাদিকরা হামলার শিকার হয়েছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রশাসনের ওপর বারবার আক্রমণ প্রমাণ করে যে, এখানকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি গুরুতর হুমকির মুখে। র্যাবের অভিযানে হামলা এবং একজন কর্মকর্তার মৃত্যু সেই ধারাবাহিকতারই সবচেয়ে রক্তাক্ত অধ্যায়। এই ঘটনা দেখিয়ে দেয় যে, মবতন্ত্র যখন শেকড় গাড়ে, তখন তা আর স্বতঃস্ফূর্ত থাকে না; বরং তা সংগঠিত হয়, নেতৃত্ব পায় এবং অর্থ ও অস্ত্রের জোগান পেতে শুরু করে।
মবতন্ত্রের সংজ্ঞা ও ধ্বংসাত্মক প্রকৃতি
মবতন্ত্র এখন আর কেবল জনতার ক্ষণিক উত্তেজনা নয়। এটি হলো আইন, নৈতিকতা ও যুক্তির পরিবর্তে সংখ্যার শক্তিকে প্রতিষ্ঠা করার প্রবণতা। মবতন্ত্রে অপরাধীর বিচার আদালত বা সংবিধান থেকে আসে না, বরং সিদ্ধান্ত আসে রাস্তায় বা মাইকের ঘোষণায়। ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী গুস্তাভ লে বোঁ তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ The Crowd : A Study of the Popular Mind-এ লিখেছিলেন: ‘ভিড়ের শক্তি মূলত ধ্বংসের জন্যই ব্যবহৃত হয়’ (Crowds are only powerful for destruction)। জঙ্গল সলিমপুরের ঘটনা সেই ধ্বংসাত্মক শক্তিরই বাস্তব উদাহরণ, যেখানে আইন প্রয়োগ করতে যাওয়া র্যাব ফিরে এসেছে লাশ ও রক্ত নিয়ে।
শাসনগত শূন্যতা ও মবতন্ত্রের উত্থান
দীর্ঘ কর্তৃত্ববাদী শাসনের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মাধ্যমে মানুষ আইনের শাসন, জবাবদিহি ও গণতান্ত্রিক চর্চা ফিরে আসার আশা করেছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে এক ধরনের শাসনগত শূন্যতা, আর সেই শূন্যতায় ঢুকে পড়েছে মবতন্ত্র। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর হামলা, ধর্মীয় উসকানি, ভূমি দখল কিংবা সাংবাদিক নির্যাতনের মতো নানা চিত্রে প্রশাসন যখন নীরব থাকে, তখন মব নিজেই বিচারক, জল্লাদ ও শাসক হয়ে ওঠে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা ও রাষ্ট্রের একচেটিয়া অধিকার
এই প্রেক্ষাপটে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। ঘটনার পর শোক, তদন্তের আশ্বাস এবং দোষীদের শনাক্ত করার ঘোষণা শোনা গেলেও, প্রায়শই দৃশ্যমান ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় না। জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার রাষ্ট্রের সংজ্ঞায় বলেছিলেন: ‘রাষ্ট্র হলো সেই সত্তা, যা বৈধভাবে বলপ্রয়োগের একচেটিয়া অধিকার দাবি করে’ (The state is the entity that claims the monopoly of the legitimate use of physical force)। যখন ৪০০-৫০০ জনের একটি দল মাইকে ঘোষণা দিয়ে র্যাবের ওপর হামলা চালাতে পারে, তখন রাষ্ট্রের সেই বলপ্রয়োগের একচেটিয়া অধিকার কার্যত প্রশ্নের মুখে পড়ে।
গণতন্ত্র বনাম বিপজ্জনক বিভ্রান্তি
অনেকেই মবের কর্মকাণ্ডকে ‘জনতার ক্ষোভ’ বা ‘স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া’ বলে হালকা করার চেষ্টা করেন। এটি একটি বিপজ্জনক বিভ্রান্তি। গণতন্ত্র মানে সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন হলেও তা সব সময় আইনের সীমার ভেতরে থাকে। কিন্তু মবতন্ত্র মানে সেই সীমা ভেঙে ফেলা। মবতন্ত্র একটি বিভ্রান্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, যেখানে সত্য-অসত্যের বিচার হয় না— আবেগই চূড়ান্ত সত্য হয়ে ওঠে।
শেষ কথা
সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরের ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে— মবতন্ত্র এখন আর কোনো প্রান্তিক সমস্যা নয়, এটি রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর সরাসরি আঘাত হানছে। এই দানবকে এখনই নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে, নির্বাচনের প্রাক্কালে গণতন্ত্র, আইন ও নিরাপত্তা— সবকিছুরই চরম মূল্য দিতে হবে।