মস্কোর সঙ্গে জ্বালানি বাণিজ্য অব্যাহত রাখলে চড়া মাশুল গুনতে হবে—মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের এমন কড়া হুঁশিয়ারির মুখে ভারত শেষ পর্যন্ত রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল (Crude Oil) কেনা বন্ধ করেছে বলে দাবি করেছে ওয়াশিংটন। স্থানীয় সময় বুধবার (২১ জানুয়ারি) মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এক সাক্ষাৎকারে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এনেছেন। ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে রুশ তেল আমদানিকারক দেশগুলোর ওপর ২৫ শতাংশ বিশেষ শুল্ক (Tariff) আরোপের ঘোষণার পরই নয়াদিল্লি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে তাঁর দাবি।
ট্রাম্পের 'শুল্ক যুদ্ধ' ও ভারতের পিছু হটা
প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ডনাল্ড ট্রাম্প বিশ্ব বাণিজ্যে আগ্রাসী নীতি গ্রহণ করেছেন। বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধের আবহে রাশিয়ার অর্থনীতিকে পঙ্গু করতে পুতিনের তেলের বাজার ধসিয়ে দেওয়া ট্রাম্পের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের মতে, ট্রাম্পের কঠোর অবস্থানের কারণেই ভারত তাদের অবস্থান পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে।
ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বেসেন্ট বলেন, "ইউক্রেন সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে ব্যাপক হারে তেল কেনা শুরু করেছিল। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যখন স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিলেন যে, রুশ তেল কিনলে ভারতীয় পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক চাপানো হবে, তখন নয়াদিল্লি মস্কোর থেকে তেল কেনা বন্ধ করে দিয়েছে।"
২৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্কের 'শাস্তি'
প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, ভারতীয় পণ্যের ওপর আগে থেকেই ২৫ শতাংশ শুল্ক কার্যকর ছিল। কিন্তু রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের ক্রমবর্ধমান তেল বাণিজ্যকে দমাতে ‘শাস্তি’ হিসেবে আরও ২৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নেন ট্রাম্প। ফলে মার্কিন বাজারে ভারতীয় পণ্যের ওপর মোট শুল্কের বোঝা দাঁড়ায় প্রায় ৫০ শতাংশ। এই বিশাল অংকের শুল্ক ভারতের রপ্তানি বাণিজ্যের (Export Sector) জন্য বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই নয়াদিল্লি তেলের উৎস পরিবর্তনের পথে হাঁটছে বলে মনে করছে ওয়াশিংটন।
৫০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্কের হুমকি: লিন্ডসে গ্রাহামের প্রস্তাব
রুশ তেল ইস্যুতে ওয়াশিংটনের চাপ এখানেই শেষ নয়। সম্প্রতি রিপাবলিকান পার্টির প্রভাবশালী সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম একটি নতুন বিলের প্রস্তাব করেছেন, যেখানে রাশিয়া থেকে তেল কেনা দেশগুলোর ওপর ৫০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক বসানোর বিধান রাখা হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইতিমধ্যেই এই বিলে প্রাথমিক সম্মতি দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
এই প্রসঙ্গে স্কট বেসেন্ট বলেন, "এটি সিনেটর গ্রাহামের একটি প্রস্তাব যা বর্তমানে বিবেচনার অধীনে রয়েছে। আমরা দেখব এটি আইনে পরিণত হয় কি না। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই ধরনের কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য আলাদা কোনো সংসদীয় অনুমোদনের প্রয়োজন নেই, তিনি তাঁর বিশেষ ক্ষমতার বলেই এটি কার্যকর করতে পারেন।"
জ্বালানি নিরাপত্তা বনাম ভূ-রাজনীতি: নয়াদিল্লির সংকট
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেই মস্কোর কাছ থেকে সস্তায় তেল কিনে আসছিল ভারত। নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে বরাবরই দাবি করা হয়েছে যে, দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর 'জ্বালানি নিরাপত্তা' (Energy Security) নিশ্চিত করা এবং মুদ্রাস্ফীতি (Inflation) নিয়ন্ত্রণে রাখা তাদের অগ্রাধিকার। ভারতের বিদেশ মন্ত্রক এর আগে ওয়াশিংটনের পদক্ষেপকে 'অন্যায় ও অযৌক্তিক' বলে অভিহিত করেছিল।
তবে বর্তমানে ট্রাম্প প্রশাসনের দ্বিমুখী চাপের মুখে—একদিকে জ্বালানি খরচ কমানো এবং অন্যদিকে মার্কিন বাজারে বাণিজ্যিক প্রবেশাধিকার বজায় রাখা—নয়াদিল্লি চরম কূটনৈতিক সংকটে পড়েছে। যদি মার্কিন অর্থমন্ত্রীর দাবি সত্য হয়, তবে এটি বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি (Geopolitics) এবং তেল বাজারে (Oil Market) ভারতের কৌশলগত অবস্থানে একটি বড় পরিবর্তন হিসেবে চিহ্নিত হবে।
এখন দেখার বিষয়, মার্কিন অর্থমন্ত্রীর এই দাবির প্রেক্ষিতে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয় কি না। কারণ, রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের কৌশলগত সম্পর্ক এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিক অংশীদারিত্বের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা এখন সাউথ ব্লকের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।