• আন্তর্জাতিক
  • ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিতে বড় ধাক্কা: বদলে যাচ্ছে মার্কিন অভিবাসন ব্যবস্থার খোলনলচে

ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিতে বড় ধাক্কা: বদলে যাচ্ছে মার্কিন অভিবাসন ব্যবস্থার খোলনলচে

আন্তর্জাতিক ১ মিনিট পড়া
ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিতে বড় ধাক্কা: বদলে যাচ্ছে মার্কিন অভিবাসন ব্যবস্থার খোলনলচে

নাগরিকত্ব থেকে ওয়ার্ক পারমিট— অভিবাসীদের জন্য কেন কঠিন হয়ে উঠছে আমেরিকা? ট্রাম্প প্রশাসনের ৫টি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ও তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব।

ডনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে মার্কিন অভিবাসন নীতিতে বইছে পরিবর্তনের প্রবল হাওয়া। ক্ষমতা গ্রহণের এক বছরের মধ্যেই অভিবাসন ব্যবস্থায় এমন কিছু মৌলিক পরিবর্তন আনা হয়েছে, যা কেবল অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদেরই নয়, বরং বৈধ পথে আসা অভিবাসীদেরও চরম দুশ্চিন্তায় ফেলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে মূল লক্ষ্য ছিল ‘Illegal Immigration’ বা অবৈধ অভিবাসন ঠেকানো; কিন্তু এবার তিনি বৈধ অভিবাসন প্রক্রিয়ার ওপরও কড়া নিয়ন্ত্রণ আরোপ করছেন।

মার্কিন শ্রমবাজার এবং সামাজিক কাঠামোয় দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে যাওয়া এই নতুন অভিবাসন ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ৫টি পরিবর্তন নিচে বিশদভাবে আলোচনা করা হলো:

১. কঠোর থেকে কঠোরতর হচ্ছে ‘Vetting’ বা যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া

যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ও অভিবাসন সেবা সংস্থা—ইউএসসিআইএস (USCIS) এখন আবেদনকারীদের তথ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রে নজিরবিহীন কড়াকড়ি শুরু করেছে। নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য যে পরীক্ষা দিতে হয়, সেটিকে আরও জটিল করার পরিকল্পনা চূড়ান্ত পর্যায়ে। এখন শুধু আবেদন জমা দিলেই হবে না, আবেদনকারীকে তার ‘Good Moral Character’ বা উন্নত নৈতিক চরিত্র, স্থানীয় কমিউনিটির সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং সমাজে তার ইতিবাচক অবদানের জোরালো প্রমাণ দিতে হচ্ছে।

একইসঙ্গে জালিয়াতি বা ফ্রড শনাক্ত করতে মাঠপর্যায়ে ‘Site Visit’ ও নজরদারি বহুগুণ বাড়ানো হয়েছে। অভিবাসন পুলিশ বা ‘ICE’ (Immigration and Customs Enforcement)-এর সঙ্গে সমন্বয় করে ইউএসসিআইএস এখন এমন এক কঠোর নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছে, যেখানে ছোটখাটো তথ্য গোপন করলেও আবেদন সরাসরি বাতিল হয়ে যাচ্ছে।

২. ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার কবলে স্থগিত হচ্ছে নতুন আবেদন

ট্রাম্প প্রশাসন গত এক বছরে বিশ্বের কয়েক ডজন দেশের নাগরিকদের ওপর নতুন করে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা (Travel Ban) জারি করেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে অভিবাসন প্রক্রিয়ায়। যেসব দেশের নাগরিকদের ওপর এই নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, তাদের নতুন কোনো ‘Asylum’ বা রাজনৈতিক আশ্রয় এবং স্থায়ী বসবাসের আবেদন কার্যত স্থগিত করে দেওয়া হয়েছে।

বর্তমানে যারা যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন, তারাও পড়েছেন চরম বিপাকে। এই নিষেধাজ্ঞার ফলে তারা তাদের ভিসার মেয়াদ বৃদ্ধি (Visa Renewal) বা বর্তমান ‘Legal Status’ পরিবর্তনের কোনো সুযোগ পাচ্ছেন না। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বৈধ অভিবাসন প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকা প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ এই নতুন নীতির কারণে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

৩. ওয়ার্ক পারমিটের মেয়াদ হ্রাস ও কর্মসংস্থানে অনিশ্চয়তা

দক্ষ বিদেশি কর্মীদের জন্য কাজের অনুমতির মেয়াদ কমিয়ে বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগে যেখানে ‘Work Permit’-এর মেয়াদ ৫ বছর পর্যন্ত পাওয়া যেত, এখন তা কমিয়ে মাত্র ১৮ মাস করা হচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, এই সংক্ষিপ্ত মেয়াদে কাজ করলে সিস্টেমের জালিয়াতি রোধ করা এবং সম্ভাব্য ‘Security Risk’ বা নিরাপত্তা ঝুঁকি চিহ্নিত করা সহজ হবে।

তবে প্রযুক্তি এবং ব্যবসায়িক খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এতে করে দক্ষ পেশাজীবীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়বে। বারবার নবায়ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়ার ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান বিদেশি কর্মী নিয়োগে নিরুৎসাহিত হতে পারে, যা আমেরিকার ‘Job Market’-এ নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

৪. ‘Public Charge’ এবং সরকারি সুবিধার নেতিবাচক প্রভাব

নতুন প্রবর্তিত ‘Public Charge’ নিয়মটি বৈধ অভিবাসীদের জন্য এক বড় আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই নিয়ম অনুযায়ী, কোনো অভিবাসী ভবিষ্যতে সরকারি সহায়তার (যেমন: ফুড স্ট্যাম্প বা চিকিৎসা সহায়তা) ওপর নির্ভরশীল হতে পারেন কি না, তা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে মূল্যায়ন করা হচ্ছে।

যদিও অবৈধ অভিবাসীরা সরাসরি সরকারি সুবিধা পান না, তবে অনেক বৈধ অভিবাসী পরিবার বা ‘Mixed-Status’ পরিবারের সদস্যরা এই নিয়মের আওতায় পড়ার ঝুঁকিতে আছেন। যদি ইউএসসিআইএস মনে করে যে কোনো আবেদনকারী ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের ওপর আর্থিক বোঝা হতে পারেন, তবে তার স্থায়ী বসবাসের আবেদন বা গ্রিন কার্ডের পথ রুদ্ধ হয়ে যেতে পারে।

৫. মানবিক কর্মসূচি বন্ধ ও টিপিএস (TPS) বাতিল

মানবিক দিক বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের কিছু কর্মসূচি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন বিশ্বের ১১টি দেশের নাগরিকদের জন্য থাকা ‘Temporary Protected Status’ বা টিপিএস সুবিধা বাতিল করেছে। এর ফলে হন্ডুরাস ও নিকারাগুয়ার প্রায় ৭৬ হাজার মানুষসহ মোট ১০ লাখের বেশি মানুষ তাদের বৈধ বসবাসের অধিকার বা ‘Legal Status’ হারিয়েছেন।

এছাড়া কিউবান, হাইতিয়ান ও ভেনেজুয়েলাসহ কয়েকটি দেশের নাগরিকদের জন্য থাকা বিশেষ ‘Parole Program’ বা প্যারোল কর্মসূচিও স্থগিত করা হয়েছে। এর ফলে এসব মানুষ এখন আইনি সুরক্ষা হারিয়ে দেশ থেকে বহিষ্কার বা ‘Deportation’-এর উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছেন।

উপসংহার:

হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি জানিয়েছেন, এসব সিদ্ধান্ত মূলত মার্কিন নাগরিকদের অর্থনৈতিক স্বার্থ ও জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য নেওয়া হয়েছে। তবে প্রয়োজনে দক্ষ শ্রমবাজারের চাহিদা মেটাতে বৈধ কর্মীদের জন্য সুযোগ রাখা হবে। অন্যদিকে, অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা—এই কঠোর নীতিগুলো যদি দীর্ঘ মেয়াদে কার্যকর থাকে, তবে যুক্তরাষ্ট্রে নাগরিকত্ব পাওয়া মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে, যা দেশটির ‘Diversity’ বা বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

Tags: white house travel ban green card us immigration trump policy work permit uscis news public charge legal status immigration reform