আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলায় নির্বাচনী প্রচারণা ও ভোট চাওয়াকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। রোববার (২৫ জানুয়ারি) বিকেলে উপজেলার যুগিরহুদা গ্রামে সংঘটিত এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে নারীসহ উভয় পক্ষের অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এলাকায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটসহ পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত: পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, রোববার দুপুরে জামায়াতে ইসলামীর একদল নারী কর্মী ওই গ্রামে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের কাছে ভোট প্রার্থনা করছিলেন। জামায়াতের অভিযোগ, তাদের কর্মীরা শান্তিপূর্ণভাবে ‘Election Campaign’ চালানোর সময় বিএনপির সমর্থকরা অহেতুক বাধা প্রদান করে। এর প্রতিবাদ করলে বাকবিতণ্ডা একপর্যায়ে সংঘর্ষে রূপ নেয়।
অন্যদিকে বিএনপির পক্ষ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন দাবি করা হয়েছে। তাদের অভিযোগ, জামায়াতের নারী কর্মীরা ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটার আইডি কার্ড (NID) ও মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে একটি ডিজিটাল ‘Data Collection’ বা ডাটাবেস তৈরির চেষ্টা করছিলেন। এমনকি সাধারণ মানুষকে পবিত্র কুরআন স্পর্শ করিয়ে শপথ করানোর মতো সংবেদনশীল কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ছিলেন তারা। বিষয়টি নিয়ে সাধারণ ভোটাররা প্রশ্ন তুললে জামায়াত কর্মীরা বহিরাগতদের ডেকে এনে লাঠিসোঁটা ও ইটপাটকেল নিয়ে হামলা চালায় বলে বিএনপির দাবি।
আহতদের পরিস্থিতি ও চিকিৎসা
এই সংঘর্ষে চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের বিএনপি ও জামায়াত—উভয় পক্ষের কর্মীরাই গুরুতর আহত হয়েছেন। চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বিএনপির ৯ জন সমর্থক হলেন—মানিক মিয়া (৩৬), মুক্তি খাতুন মুক্তা (৩৫), রাকিব (১৯), রিক্তা খাতুন (২৬), হায়দার আলী বিশ্বাস (৬২), মিজানুর রহমান (৫৫), আসাদুল হক (৫২), রেমনি খাতুন (২০) ও আরাফাত আলী (২৪)। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক আফরিনা ইসলাম জানান, আহতদের শরীরে ভোঁতা অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন রয়েছে এবং তাদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা (Medical Treatment) নিশ্চিত করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, জামায়াতের পক্ষ থেকে ওল্টু, মাসুদ, বাদশা, আরিফুল ও ইমরানসহ পাঁচজন আহত হওয়ার খবর জানানো হয়েছে। জামায়াত সমর্থিত প্রার্থী মাসুদ পারভেজ রাসেল জানান, তাদের আহত কর্মীদের আলমডাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে এবং একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাকে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়েছে।
প্রার্থী ও নেতৃত্বের প্রতিক্রিয়া
চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের ধানের শীষের প্রার্থী শরীফুজ্জামান এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, “শান্তিপূর্ণ নির্বাচনী পরিবেশকে পরিকল্পিতভাবে অশান্ত করা হচ্ছে। জামায়াতের বহিরাগত ক্যাডাররা আমাদের নেতাকর্মীদের ওপর বর্বরোচিত হামলা চালিয়েছে।”
পাল্টা বক্তব্যে জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী মাসুদ পারভেজ রাসেল বলেন, “আমাদের নারী কর্মীরা যখন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ভোট চাইছেন, তখন তাদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। এটি নির্বাচনী শিষ্টাচারের পরিপন্থি।”
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অবস্থান ও বর্তমান পরিস্থিতি
ঘটনার খবর পাওয়ার পরপরই আলমডাঙ্গা থানা পুলিশ ও সেনাবাহিনীর একটি বিশেষ দল যুগিরহুদা গ্রামে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ঘটনাস্থলে অবস্থান করে শান্তিশৃঙ্খলা তদারকি করছেন।
আলমডাঙ্গা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) হোসেন আলী সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, বর্তমানে গ্রামের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। নির্বাচনী এলাকায় যাতে কোনো ধরনের ‘Ground Level Chaos’ তৈরি না হয়, সেদিকে সর্বোচ্চ সজাগ দৃষ্টি রাখা হচ্ছে।