• দেশজুড়ে
  • ২ কোটি টাকার সেতু যেন ‘আকাশকুসুম’: উঠতে লাগে মই, ঝালকাঠিতে চরম ভোগান্তিতে হাজারো মানুষ

২ কোটি টাকার সেতু যেন ‘আকাশকুসুম’: উঠতে লাগে মই, ঝালকাঠিতে চরম ভোগান্তিতে হাজারো মানুষ

দেশজুড়ে ১ মিনিট পড়া
২ কোটি টাকার সেতু যেন ‘আকাশকুসুম’: উঠতে লাগে মই, ঝালকাঠিতে চরম ভোগান্তিতে হাজারো মানুষ

সংযোগ সড়কের অভাবে দুই বছর ধরে অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে রাজাপুরের গালুয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সংলগ্ন ব্রিজটি; ঠিকাদারের অবহেলা ও প্রশাসনের উদাসীনতায় ক্ষোভ এলাকাবাসীর।

ঝালকাঠি: আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় সাধারণত সেতু নির্মাণ করা হয় জনভোগান্তি কমাতে। কিন্তু ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলায় চিত্রটি সম্পূর্ণ উল্টো। এখানে প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি দৃষ্টিনন্দন সেতু এখন স্থানীয়দের জন্য ‘গলার কাঁটা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেতুর মূল অবকাঠামো বা Main Structure দাঁড়িয়ে থাকলেও নেই কোনো সংযোগ সড়ক (Approach Road)। ফলে অসুস্থ রোগী থেকে শুরু করে স্কুলগামী শিশু—সবাইকেই এই বিশাল সেতুতে উঠতে হচ্ছে কাঠের মই বেয়ে।

উন্নয়নের নামে জনদুর্ভোগের এক করুণ উপাখ্যান

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বরিশাল-ভাণ্ডারিয়া আঞ্চলিক মহাসড়কের গালুয়া বাজারের পাশে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সংলগ্ন পুরাতন ও জরাজীর্ণ সেতুটি ভেঙে নতুন করে নির্মাণের উদ্যোগ নেয় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (LGED)। ১ কোটি ৬২ লাখ ৯২ হাজার টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে ২০২২ সালের ডিসেম্বর মাসে এই সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে সেতুর ঢালাইয়ের কাজ সম্পন্ন হলেও রহস্যজনক কারণে থমকে যায় সংযোগ সড়কের কাজ।

সরেজমিনে দেখা গেছে, সেতুর দুই পাশে কোনো মাটি ভরাট করা হয়নি। খাড়া পিলারের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সেতুতে ওঠার জন্য এলাকাবাসী নিজ উদ্যোগে কাঠের মই তৈরি করে নিয়েছেন। যা দিয়ে চলাচল করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে গালুয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসা মুমূর্ষু রোগী এবং গর্ভবতী নারীদের জন্য এই পথ এখন এক বিভীষিকার নাম।

বিপাকে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ

স্থানীয় বাসিন্দা হেয়ামুল হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "এই সেতু দিয়ে প্রতিদিন অন্তত দুই হাজার মানুষ যাতায়াত করেন। হাসপাতালের রোগী কিংবা বয়স্কদের কাঁধে করে মই দিয়ে ওপরে তুলতে হয়। গাড়ি চলাচলের কথা থাকলেও এখন মানুষ পায়ে হেঁটে চলতেই হিমশিম খাচ্ছে। দুই বছর ধরে আমরা এই আদিম যুগের ভোগান্তি পোহাচ্ছি, কিন্তু কর্তৃপক্ষের কোনো হুঁশ নেই।"

মাদ্রাসা শিক্ষার্থী কাওছার হোসেনের কণ্ঠেও ঝরল আতঙ্ক। সে জানায়, "প্রতিদিন এই মই বেয়েই আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেতে হয়। পা পিছলে পড়ে যাওয়ার ভয় সবসময় কাজ করে। বিশেষ করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছোট বাচ্চাদের জন্য এটি যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।"

ঠিকাদারের পরিচয় ও প্রশাসনের ভূমিকা

অভিযোগ উঠেছে, এই প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার ঝালকাঠি জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি সৈয়দ হাদিসুর রহমান মিলন। তিনি বর্তমানে একটি অস্ত্র মামলায় কারাগারে রয়েছেন এবং তার বিরুদ্ধে একাধিক ফৌজদারি মামলা রয়েছে বলে জানা গেছে। রাজনৈতিক প্রভাব ও ঠিকাদারের ব্যক্তিগত সমস্যার কারণেই কি প্রকল্পের (Project) কাজ এভাবে ঝুলে আছে—এমন প্রশ্ন এখন সাধারণ মানুষের মনে।

এদিকে, এলজিইডি (LGED) কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। দীর্ঘ দুই বছরেও কেন সংযোগ সড়কের কাজ শেষ করা গেল না, তার কোনো সদুত্তর মেলেনি এতদিন। তবে রাজাপুর উপজেলা প্রকৌশলী অভিজিৎ মজুমদার জনদুর্ভোগের বিষয়টি স্বীকার করে নিয়ে বলেন, "অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করার জন্য আমরা বিকল্প ব্যবস্থা নিচ্ছি। বর্তমান ঠিকাদারের কাজ বাতিল করে নতুন করে পুন:দরপত্র (Re-tender) আহ্বান করা হবে যাতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে জনদুর্ভোগ লাঘব করা যায়।"

শেষ কথা

একটি জনগুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এভাবে দুই বছর ধরে অকেজো পড়ে থাকা কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতাই নয়, বরং রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় হিসেবেও দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। ঝালকাঠিবাসীর দাবি, অবিলম্বে প্রশাসনিক আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কাটিয়ে সংযোগ সড়ক নির্মাণ করে সেতুটি চলাচলের উপযোগী করা হোক।

Tags: local news rural development jhalakathi news public suffering bridge construction lged projects rajapur bridge contractor negligence bangladesh infrastructure road connectivity