• জীবনযাপন
  • বিনিয়োগ যখন পায়ের সুরক্ষায়: ব্র্যান্ডের দামী জুতো কি কেবলই বিলাসিতা, না কি সুস্বাস্থ্যের চাবিকাঠি?

বিনিয়োগ যখন পায়ের সুরক্ষায়: ব্র্যান্ডের দামী জুতো কি কেবলই বিলাসিতা, না কি সুস্বাস্থ্যের চাবিকাঠি?

জীবনযাপন ১ মিনিট পড়া
বিনিয়োগ যখন পায়ের সুরক্ষায়: ব্র্যান্ডের দামী জুতো কি কেবলই বিলাসিতা, না কি সুস্বাস্থ্যের চাবিকাঠি?

তর্কের ঊর্ধ্বে গিয়ে বিজ্ঞান যা বলছে—পায়ের হাড়, মেরুদণ্ড ও দীর্ঘমেয়াদী সুস্থতায় ভালো মানের জুতোর ভূমিকা অনস্বীকার্য।

আমাদের সমাজতত্ত্বে একটি প্রচলিত ধারণা হলো—দামী পণ্য মানেই আভিজাত্যের প্রদর্শন। এই ধারণা থেকেই অনেকে হাজার হাজার টাকা খরচ করে নামী ব্র্যান্ডের পণ্য কেনাকে নিছক বিলাসিতা মনে করেন। সম্প্রতি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের একজোড়া ‘নাইকি’ (Nike) জুতো পরাকে কেন্দ্র করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা ও রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তবে এই তর্কের গণ্ডি পেরিয়ে যদি আমরা জনস্বাস্থ্য এবং বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে তাকাই, তবে প্রশ্ন জাগে—দামী জুতো কি সত্যিই শরীরের জন্য কোনো ইতিবাচক প্রভাব ফেলে? হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল এবং বিশ্বখ্যাত পডিয়াট্রিস্ট বা পা-বিশেষজ্ঞদের গবেষণায় উঠে এসেছে কিছু চমকপ্রদ তথ্য।

১. পায়ের অ্যানাটমি ও আর্চ সাপোর্ট: কেন দামী জুতোর সোল আলাদা?

একটি ভালো মানের বা ব্র্যান্ডের জুতোর প্রধান বিশেষত্ব এর ব্র্যান্ডিং নয়, বরং এর ইঞ্জিনিয়ারিং। নামী ব্র্যান্ডগুলো বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে মানুষের পায়ের ‘অ্যানাটমি’ গবেষণায়। বিশেষজ্ঞজদের মতে, দামী জুতোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর ‘আর্চ সাপোর্ট’ (Arch Support) এবং ‘কুশনিং’ (Cushioning)। এটি হাঁটার সময় শরীরের সম্পূর্ণ ওজন পায়ের পাতার ওপর সমানভাবে ছড়িয়ে দেয়। বিপরীতে, নিম্নমানের জুতোর সোল শক্ত বা অসম হওয়ায় পায়ের তলায় দীর্ঘমেয়াদী ব্যথার সৃষ্টি করতে পারে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘প্লান্টার ফ্যাসাইটিস’ (Plantar Fasciitis) বলা হয়। উন্নত প্রযুক্তির জুতো এই ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে দেয়।

২. হাঁটু, কোমর ও মেরুদণ্ডের রক্ষাকবচ: ভুল জুতোয় পঙ্গুত্বের ঝুঁকি?

পায়ের অবস্থান ঠিক না থাকলে তার নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি পড়ে আমাদের হাঁটু, কোমর এবং মেরুদণ্ডে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভুল জুতো ব্যবহার করলে হাঁটার সময় শরীরের ‘ভারসাম্য’ নষ্ট হয়। এতে হাঁটুর হাড়ের সংযোগস্থলে বা জয়েন্টে অতিরিক্ত চাপ পড়ে, যা পরবর্তীকালে অকাল ‘অস্টিওআর্থ্রাইটিস’ (Osteoarthritis) বা হাড়ক্ষয়ের কারণ হতে পারে। ব্র্যান্ডের জুতো এমনভাবে ডিজাইন করা হয় যা মেরুদণ্ডকে সঠিক অবস্থানে (Spine Alignment) রাখতে সাহায্য করে, ফলে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলেও বা হাঁটলেও ক্লান্তি ও শারীরিক জটিলতা কম হয়।

৩. সংক্রমণ ও চর্মরোগ রোধ: পা যখন ‘শ্বাস’ নেয়

সস্তা বা সাধারণ জুতোর সিনথেটিক উপাদানে বাতাস চলাচলের পর্যাপ্ত সুযোগ থাকে না। এতে পা ঘামলে তা শুকোয় না, ফলে পায়ে দুর্গন্ধ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি ভয়াবহ ‘ফাঙ্গাল ইনফেকশন’ (Fungal Infection) ও ফোসকা পড়ার ঝুঁকি থাকে। ভালো ব্র্যান্ডের জুতো সাধারণত উন্নত চামড়া বা ‘ব্রিদবল’ (Breathable) ফেব্রিক দিয়ে তৈরি হয়, যা পা-কে শুকনো রাখতে এবং শ্বাস নিতে সাহায্য করে। বিশেষ করে যাদের দীর্ঘ সময় জুতো পরে থাকতে হয়, তাদের জন্য এটি বিলাসিতা নয় বরং স্বাস্থ্যবিধি বা হাইজিনের অংশ।

৪. দীর্ঘমেয়াদী সাশ্রয় ও ‘কস্ট-পার-অয়্যার’

অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, সস্তার জুতো বারবার কেনার চেয়ে একবার দামী ও টেকসই জুতো কেনা অনেক বেশি সাশ্রয়ী। একটি উন্নত মানের জুতো কয়েক বছর সার্ভিস দিতে পারে, যেখানে সাধারণ জুতো কয়েক মাসেই নষ্ট হয়ে যায়। একে বলা হয় ‘কস্ট-পার-অয়্যার’ (Cost-per-wear) সুবিধা। অর্থাৎ, একবার বড় বিনিয়োগ করলেও দীর্ঘমেয়াদে তা সাশ্রয়ী এবং এর পাশাপাশি চিকিৎসা খরচ বাঁচানোর সুবিধাও যোগ হয়।

বিশেষজ্ঞ অভিমত

পেশাদার অ্যাথলেট বা নিয়মিত দীর্ঘপথ হাঁটা মানুষের জন্য ভালো মানের জুতো বাছাই করা অপরিহার্য। চিকিৎসকদের মতে, জুতো কেনার সময় কেবল ব্র্যান্ডের লোগো নয়, বরং জুতোর আরাম, উপাদানের মান এবং পায়ের মাপের সঠিক সামঞ্জস্য দেখা উচিত। যদি উচ্চমূল্যের বিনিময়ে পায়ের চিরস্থায়ী সুরক্ষা নিশ্চিত হয়, তবে তাকে নিছক বিলাসিতা না বলে ‘হেলথ ইনভেস্টমেন্ট’ বা স্বাস্থ্যকর বিনিয়োগ বলাই যুক্তিযুক্ত। দিনশেষে সুস্থভাবে চলাচলের সামর্থ্যই একজন মানুষের শ্রেষ্ঠ সম্পদ।

Tags: luxury lifestyle spinal health branded shoes nike controversy health investment arch support orthopedic shoes plantar fasciitis podiatrist advice footwear science