২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের আয়োজক হিসেবে প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় পার করছে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো। তবে মাঠের প্রস্তুতির সমান্তরালে মাঠের বাইরের রাজনীতি ও কূটনৈতিক টানাপড়েন এখন তুঙ্গে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিতর্কিত ‘অভিবাসন বিরোধী’ অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক নানা ইস্যুতে নেওয়া পদক্ষেপের প্রতিবাদে এবার সরাসরি বিশ্বকাপ বয়কটের ডাক দিলেন ফিফার সাবেক সভাপতি সেপ ব্লাটার। সমর্থকদের প্রতি তার স্পষ্ট বার্তা—যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিতব্য এই ফুটবল মহাযজ্ঞ দেখতে দেশটিতে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।
ট্রাম্পের নীতি ও ব্লাটারের কঠোর অবস্থান.
৮৯ বছর বয়সী সাবেক ফিফা প্রধান ব্লাটার অভিযোগ করেছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন বিশ্বকাপের আগে সমর্থকদের প্রতি সহনশীল হওয়ার পরিবর্তে একের পর এক কঠোর এবং আগ্রাসী আইন জারি করছে। বিশেষ করে ট্রাম্পের Immigration Policy বা কঠোর অভিবাসন নীতি এবং নির্দিষ্ট কিছু দেশের ওপর Travel Ban বা ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার কারণে সাধারণ সমর্থকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে।
ব্লাটার বলেন, “সমর্থকদের জন্য আমার একটাই পরামর্শ—যুক্তরাষ্ট্র থেকে দূরত্ব বজায় রাখুন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশাসনের যে ধরনের বিরূপ আচরণ, তাতে সেখানে গিয়ে খেলা দেখা সমর্থকদের নিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।”
গ্রিনল্যান্ড ইস্যু ও বৈশ্বিক বয়কটের হুমকি
বিশ্বকাপের ওপর কালো মেঘ ঘনীভূত হওয়ার পেছনে গ্রিনল্যান্ড ইস্যু একটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড ‘দখল’ বা কিনে নেওয়ার বিষয়ে ট্রাম্পের আগ্রহ ও তৎপরতা কূটনৈতিক মহলে তীব্র অসন্তোষ তৈরি করেছে। এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে জার্মানি ও ডেনমার্কসহ ইউরোপের বেশ কয়েকটি প্রভাবশালী দেশ বিশ্বকাপ বয়কটের পরিকল্পনা করছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে খবর চাউর হয়েছে।
পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং মিনেপোলিসে বিক্ষোভ দমন করতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে প্রাণহানির ঘটনায় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোও ক্ষুব্ধ। ব্লাটার মনে করেন, এমন একটি অস্থিতিশীল পরিবেশে বিশ্বকাপের মতো বড় টুর্নামেন্ট আয়োজন প্রশ্নবিদ্ধ।
ইনফান্তিনোকে কড়া সমালোচনা
ব্লাটার কেবল ট্রাম্পকেই আক্রমণ করেননি, ধুয়ে দিয়েছেন ফিফার বর্তমান সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকেও। ব্লাটারের মতে, ফিফার বর্তমান নেতৃত্ব ট্রাম্পের প্রতিটি সিদ্ধান্তে অন্ধভাবে সায় দিচ্ছে, যা সংস্থার স্বকীয়তা নষ্ট করছে। তিনি সুইজারল্যান্ডের দুর্নীতিবিরোধী আইনজীবী মাক পিয়েথের সুর মিলিয়ে বলেন, “পিয়েথ যে প্রশ্নগুলো তুলেছেন তা অত্যন্ত যৌক্তিক। ফিফার বর্তমান প্রশাসন কেবল বাণিজ্যিক স্বার্থ দেখছে, সমর্থকদের আবেগ বা মানবাধিকার নয়।”
প্রেক্ষাপট ও অতীত বিতর্ক
উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে দুর্নীতির অভিযোগে ফিফা থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন সেপ ব্লাটার। দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে গত বছর তিনি ও উয়েফার সাবেক প্রধান মিশেল প্লাতিনি সেসব অভিযোগ থেকে মুক্তি পান। তবে পদ হারানোর দীর্ঘ সময় পরও ফুটবল বিশ্বের নীতিনির্ধারণী বিষয়ে ব্লাটারের প্রভাব এখনো শেষ হয়ে যায়নি। তার এই বয়কটের ডাক আসরে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
৪৮ দলের অংশগ্রহণে ইতিহাসের বৃহত্তম বিশ্বকাপ আয়োজনের যখন তোড়জোড় চলছে, তখন ব্লাটারের এই ‘বয়কট’ মিশন যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করল। শেষ পর্যন্ত সমর্থকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নাকি রাজনৈতিক প্রতিবাদ—২০২৬ বিশ্বকাপে কোনটির পাল্লা ভারী হয়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।