মরুশহর দুবাই মানেই বিস্ময়কর সব স্থাপত্যশৈলী আর গগনচুম্বী উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। এবার সেই মুকুটে যুক্ত হতে যাচ্ছে আরও একটি উজ্জ্বল পালক। বিশ্বজুড়ে ‘সিটি অব গোল্ড’ হিসেবে পরিচিত দুবাই এবার তৈরি করতে যাচ্ছে বিশ্বের প্রথম ‘গোল্ড স্ট্রিট’ (Gold Street) বা স্বর্ণের সড়ক। দুবাইয়ের ঐতিহ্যবাহী গোল্ড ডিস্ট্রিক্ট বা স্বর্ণাঞ্চলকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা এই বিশেষ সড়কটি কেবল একটি পর্যটন আকর্ষণ নয়, বরং এটি হতে যাচ্ছে বৈশ্বিক স্বর্ণ বাণিজ্যের এক অনন্য ‘হাব’।
স্বর্ণ বাণিজ্যের নতুন বৈশ্বিক গন্তব্য
মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) দুবাইয়ের শীর্ষস্থানীয় রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার (Real Estate Developer) প্রতিষ্ঠান ‘ইথরা দুবাই’ আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন এই ‘গোল্ড ডিস্ট্রিক্ট’ প্রকল্পের ঘোষণা দেয়। এই প্রকল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে ‘গোল্ড স্ট্রিট’, যা একটি বৈশ্বিক ল্যান্ডমার্ক (Landmark) হিসেবে আবির্ভূত হবে। এখানে খুচরা বা রিটেইল (Retail), পাইকারি বা হোলসেল (Wholesale) এবং বুলিয়ন ট্রেডসহ (Bullion Trade) স্বর্ণ ও গহনা সংক্রান্ত যাবতীয় ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালিত হবে এক ছাদের নিচে। যদিও এই ‘স্বর্ণের রাস্তা’ নির্মাণের কারিগরি ও স্থাপত্য সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য এখনো গোপন রাখা হয়েছে, তবে ধারণা করা হচ্ছে এটি হবে আধুনিক প্রযুক্তি ও আভিজাত্যের এক অভূতপূর্ব সংমিশ্রণ।
এক ছাদের নিচে সব বিলাসিতা: ‘হোম অব গোল্ড’
দুবাই গোল্ড ডিস্ট্রিক্ট পরিচিত হবে ‘হোম অব গোল্ড’ নামে। কেবল সোনা বা গহনাই নয়, এখানে বিনিয়োগ বা ইনভেস্টমেন্ট (Investment), প্রিমিয়াম সুগন্ধি, প্রসাধনী এবং হাই-এন্ড লাইফস্টাইল পণ্যগুলোর বিশাল সমাহার থাকবে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের বাণিজ্যিক কৌশলের অংশ হিসেবে এই প্রকল্পে ১ হাজারের বেশি খুচরা বিক্রেতাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ইতিমধ্যেই জাওহারা জুয়েলারি, মালাবার গোল্ড অ্যান্ড ডায়মন্ডস, আল রোমাইজান এবং টাটা গ্রুপের তানিশক জুয়েলারির মতো আন্তর্জাতিক টেক জায়ান্ট ও গহনা ব্র্যান্ডগুলো সেখানে তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম শুরু করেছে। এছাড়া প্রখ্যাত জুয়েলারি প্রতিষ্ঠান ‘জয়ালুক্কাস’ মধ্যপ্রাচ্যে তাদের বৃহত্তম শোরুম (২৪ হাজার বর্গফুট) চালুর চূড়ান্ত পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।
অর্থনৈতিক শক্তি ও বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব
দুবাইয়ের এই নতুন উদ্যোগের পেছনে রয়েছে এক শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ৫৩.৪১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের স্বর্ণ রফতানি করেছে। এই বিপুল পরিমাণ স্বর্ণের প্রধান বাণিজ্য অংশীদার ছিল সুইজারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, ভারত, হংকং ও তুরস্ক। নতুন এই ‘গোল্ড স্ট্রিট’ চালু হলে বৈশ্বিক বাজারে দুবাইয়ের মার্কেট ভ্যালু (Market Value) এবং নিয়ন্ত্রণ আরও সুসংহত হবে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধন
ইথরা দুবাইয়ের সিইও ইসাম গালাদারি প্রকল্পের গুরুত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, “দুবাই গোল্ড ডিস্ট্রিক্ট ঐতিহ্য, বিশাল পরিসর এবং সম্ভাবনার এক অনন্য সংমিশ্রণ তৈরি করেছে, যা বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করবে।” অন্যদিকে, দুবাই ফেস্টিভ্যালস অ্যান্ড রিটেইল এস্টাব্লিশমেন্টের সিইও আহমেদ আল খাজা জানান, স্বর্ণ দুবাইয়ের সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক কাঠামোর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এটি কেবল একটি ধাতু নয়, বরং সমৃদ্ধি এবং উদ্যোগী চেতনার প্রতীক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রকল্প কেবল দুবাইয়ের পর্যটন খাতকেই সমৃদ্ধ করবে না, বরং মধ্যপ্রাচ্যে কর্মসংস্থান সৃষ্টি (Job Creation) এবং ফরেন ডিরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট বা এফডিআই (FDI) আকর্ষণেও বড় ভূমিকা রাখবে। টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা মাথায় রেখে এবং সৃজনশীলতাকে প্রাধান্য দিয়ে তৈরি হতে যাওয়া এই স্বর্ণের সড়ক বিশ্ব বাণিজ্য মানচিত্রে দুবাইয়ের অবস্থানকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।