ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC)-কে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে কালো তালিকাভুক্ত করার প্রতিক্রিয়ায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) সদস্য দেশগুলোর সশস্ত্র বাহিনীকে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে ঘোষণা করার পরিকল্পনা করছে ইরান। তেহরানের শীর্ষ নীতিনির্ধারক ও জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে আসা এই হুঁশিয়ারি মধ্যপ্রাচ্য তথা বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করেছে।
ইউরোপকে ‘পরিণতি’ ভোগের হুঁশিয়ারি
ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের (SNSC) সাবেক সচিব ও প্রভাবশালী নেতা আলি লারিজানি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে এই কঠোর বার্তা দেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, আইআরজিসি-র বিরুদ্ধে ইউরোপীয় দেশগুলোর এই পদক্ষেপের ফলাফল হবে সুদূরপ্রসারী এবং এর জন্য ইউরোপকে চরম মূল্য দিতে হবে। লারিজানির মতে, ইরানের সার্বভৌম শক্তির প্রতীক আইআরজিসি-কে অবমাননা করার অর্থ হলো সরাসরি সংঘাতকে উসকে দেওয়া।
মার্কিন রণতরী ও ঘাঁটিতে হামলার হুমকি
ইউরোপের পাশাপাশি ইরানের নিশানায় রয়েছে মার্কিন সামরিক উপস্থিতিও। তেহরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, ইরানের ওপর কোনো ধরনের সামরিক আগ্রাসন চালানো হলে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি (Military Bases) এবং বিমানবাহী রণতরীগুলোকে (Aircraft Carrier) তাৎক্ষণিকভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হবে।
ইরানের সামরিক মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আকরামিনিয়া রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেন, মার্কিন বিমানবাহী রণতরীগুলোর সুরক্ষায় ‘গুরুতর দুর্বলতা’ রয়েছে। তিনি আরও জানান, উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যতগুলো সামরিক স্থাপনা রয়েছে, তার সবগুলোই বর্তমানে ইরানের মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের (Middle-range Missiles) আওতার মধ্যে রয়েছে।
ট্রাম্পের চাপ ও পরমাণু চুক্তির ভবিষ্যৎ
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতোমধ্যে তেহরানকে সতর্ক করেছেন যে, পরমাণু চুক্তিতে (Nuclear Deal) আসার জন্য ইরানের হাতে সময় ফুরিয়ে আসছে। ওয়াশিংটনের এই কড়া অবস্থানের মধ্যেই আইআরজিসি-কে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করা ইইউ-র সিদ্ধান্তকে ‘কূটনৈতিক যুদ্ধ’ হিসেবে দেখছে তেহরান। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমা দেশগুলোর এই সমন্বিত চাপ ইরানকে আরও রক্ষণাত্মক ও আক্রমণাত্মক সামরিক অবস্থানের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
অনড় অবস্থান যুক্তরাজ্যের: স্টারমারের বার্তা
এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। তিনি বিবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট জানিয়েছেন, ইরান যাতে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র (Nuclear Weapons) তৈরি করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা তার সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার।
স্টারমার বলেন, “লক্ষ্য একটাই—ইরান যেন নিউক্লিয়ার পাওয়ার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে না পারে। এটি বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।” ইরানকে ঠেকাতে প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য মিত্র দেশগুলোর সাথে সম্ভাব্য সামরিক বা কূটনৈতিক পদক্ষেপের বিষয়েও আলোচনা চলছে বলে ইঙ্গিত দেন তিনি।
জটিল হচ্ছে আঞ্চলিক নিরাপত্তা সমীকরণ
ইরান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের এই ত্রিমুখী সংঘাতের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখন খাদের কিনারায়। একদিকে তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার আস্ফালন, অন্যদিকে পশ্চিমাদের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক নিষেধাজ্ঞা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি একটি বড় ধরনের আঞ্চলিক যুদ্ধের (Regional Conflict) দিকে মোড় নিচ্ছে কি না, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা।