বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের অফিসিয়াল ‘এক্স’ (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেল থেকে নারীদের নিয়ে একটি চরম আপত্তিকর পোস্ট শেয়ার হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় উঠেছে। তবে দলটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, আমিরের আইডিটি সাইবার হামলার (Cyber Attack) শিকার হয়েছে এবং হ্যাকাররাই এই বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) সকালে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দীর্ঘ ব্যাখ্যা দিয়েছেন জামায়াত আমির।
‘এক্স’ হ্যান্ডেলে ঠিক কী ঘটেছিল?
শনিবার (৩১ জানুয়ারি) বিকেলে জামায়াত আমিরের এক্স হ্যান্ডেল (X Handle) থেকে একটি পোস্ট ভাইরাল হয়, যেখানে কর্মজীবী নারীদের নিয়ে অত্যন্ত অবমাননাকর মন্তব্য করা হয়। ওই পোস্টে নারীদের পেশাজীবী জীবনকে ‘আধুনিক পতিতাবৃত্তি’র সঙ্গে তুলনা করা হয়েছিল। পোস্টটি মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে গেলে জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এর পরপরই জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী প্রচার টিম থেকে জানানো হয়, আমিরের অ্যাকাউন্টে সাইবার হামলা হয়েছে এবং এ বিষয়ে একটি সাধারণ ডায়েরি (GD) করা হয়েছে।
নারীদের নিয়ে জামায়াতের ‘আসল’ অবস্থান কী?
বিভ্রান্তি দূর করতে ডা. শফিকুর রহমান আজ সকালে ফেসবুকে একটি বিবৃতি দেন। তিনি দাবি করেন, জামায়াতের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করতে একটি গোষ্ঠী সুপরিকল্পিতভাবে মিথ্যা কন্টেন্ট (Misleading Content) প্রচার করছে। তার ভাষায়, “আমাদের ইশতেহার প্রথম দিন থেকেই স্পষ্ট। আমরা চাই শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, প্রশাসন এবং উদ্যোক্তা হিসেবে নারীরা সক্রিয় ভূমিকা পালন করুক।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, প্রতিটি জেলায় নারী-কেন্দ্রিক স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ ক্যাম্পাস, কর্মক্ষেত্রে সমান বেতন এবং হয়রানির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ (Zero Tolerance) নীতিতে জামায়াত প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমিরের দাবি, এই অবস্থানটি কোনো অনলাইন চাপের মুখে পড়ে নেওয়া নয়, বরং এটি তাদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন।
বিতর্কের শিকড় ও পুরনো প্রসঙ্গ
সাম্প্রতিক এই ‘আইডি হ্যাক’ বিতর্কটি এমন এক সময়ে এল যখন জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের নারী বিষয়ক পূর্ববর্তী কিছু মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নতুন করে আলোচনায় আসছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘আল-জাজিরা’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ডা. শফিকুর রহমান সরাসরি জানিয়েছিলেন যে, জামায়াতে ইসলামীর আমির পদে কোনো নারীর আসা সম্ভব নয়।
এছাড়া, সম্প্রতি বরগুনা জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি মোহাম্মদ শামীম আহসানের একটি মন্তব্য নিয়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)-কে ‘বেশ্যাখানা’র সঙ্গে তুলনা করেছিলেন, যার জেরে তাকে দল থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এসব ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই আমিরের এক্স হ্যান্ডেল থেকে আসা বিতর্কিত পোস্টটি দলকে বেশ অস্বস্তিতে ফেলেছে।
৩ ফেব্রুয়ারির ‘রোডম্যাপ’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই বিতর্কিত পরিস্থিতির ‘ড্যামেজ কন্ট্রোল’ করতে ৩ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে ইশতেহার (Manifesto) প্রকাশ করতে যাচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। ডা. শফিকুর রহমান জানিয়েছেন, ওই ইশতেহারে নারীদের শিক্ষা, আইনি সুরক্ষা এবং অর্থনৈতিক মর্যাদা নিশ্চিত করার বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা বিস্তারিত তুলে ধরা হবে। তিনি বলেন, “নারীর প্রতি সম্মান দেখানোই একটি এগিয়ে যাওয়া বাংলাদেশের পরিচয়।”
এখন দেখার বিষয়, ৩ ফেব্রুয়ারির ইশতেহারের মাধ্যমে জামায়াত তাদের দীর্ঘদিনের রক্ষণশীল ইমেজ ভেঙে একটি আধুনিক ও নারীবান্ধব রাজনৈতিক রূপরেখা তুলে ধরতে পারে কি না।