শিক্ষানীতির দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও প্রতিবন্ধকতা জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ সালের আলোকে শিক্ষা আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হলেও এটি দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে আলোর মুখ দেখেনি। এর মূল কারণ ছিল বিতর্কিত নোট-গাইড ও কোচিং বাণিজ্যের সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের শক্তিশালী প্রভাব ও বাধা। আইনটি যাতে পাস না হয়, সেজন্য তারা নেপথ্যে কলকাঠি নেড়েছেন। এর আগে দুইবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং একবার আইন মন্ত্রণালয় থেকে নানা অজুহাতে আইনের খসড়াটি ফেরত পাঠানো হয়েছিল। অবশেষে সেই স্থবিরতা কাটিয়ে আইনটি চূড়ান্ত করতে ফের উদ্যোগ নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
খসড়া আইনের মূল লক্ষ্য ও কঠোর প্রস্তাবনা শিক্ষা আইন ২০২৬-এর মূল লক্ষ্য হলো আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে কোচিং সেন্টার ও গাইড বইয়ের দৌরাত্ম্য চিরতরে বন্ধ করা। খসড়ায় বলা হয়েছে—
- বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে প্রশ্ন-উত্তর সংবলিত গাইড বই প্রকাশ করা যাবে না। তবে সরকার অনুমোদিত সহায়ক পুস্তক রাখা যেতে পারে।
- কোচিং বা প্রাইভেট টিউশন নিয়ন্ত্রণে আলাদা বিধিমালা প্রণয়ন করা হবে এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এগুলো স্থায়ীভাবে বন্ধের কার্যকর পদক্ষেপ নেবে সরকার।
- শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা আনতে ন্যাশনাল এডুকেশন একাডেমি গঠন এবং এনটিআরসিএর মাধ্যমে নিয়োগের ব্যবস্থা থাকবে।
- প্রাক-প্রাথমিক থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত নতুন প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করা হবে।
জাল সনদ ও শারীরিক শাস্তিতে ‘জিরো টলারেন্স’ খসড়া আইনে জাল সার্টিফিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর 'জিরো টলারেন্স' নীতি ঘোষণা করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি জাল সনদ ব্যবহার করে চাকরি করলে দণ্ডবিধি অনুযায়ী তা গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানপ্রধানকে দ্রুত মামলা দায়েরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এছাড়াও, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক শাস্তি, মানসিক নিপীড়ন, র্যাগিং ও বুলিংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থার বিধান রাখা হয়েছে।
শিক্ষাব্যবস্থায় আরও নতুনত্ব প্রস্তাবিত আইনে শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিকায়নের জন্য আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যুক্ত করা হয়েছে:
- ইংরেজি মাধ্যমেও বাংলা ভাষা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পাঠ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
- পাঠ্যক্রমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও আইসিটি অন্তর্ভুক্তির বিধান রাখা হয়েছে।
- উচ্চশিক্ষায় নতুনত্ব আনতে অভিন্ন গ্রেডিং ও সমন্বিত গবেষণা পদ্ধতি চালুর বিধান রাখা হয়েছে।
জনমত যাচাইয়ের সময়সীমা নিয়ে বিতর্ক এত গুরুত্বপূর্ণ একটি আইন চূড়ান্ত করার আগে জনমত যাচাইয়ের জন্য মাত্র পাঁচ দিন সময় দেওয়ায় শিক্ষাবিদ ও গবেষকরা প্রশ্ন তুলেছেন। মতামত প্রদানের জন্য আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৫টা পর্যন্ত প্রস্তাবিত এই খসড়াটি সর্বসাধারণের পর্যালোচনার জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। জমা পড়া যৌক্তিক পরামর্শগুলো বিবেচনা করেই আইনটি চূড়ান্ত করা হবে বলে জানিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।