লিবিয়ার দীর্ঘকালীন শাসক কর্নেল মুয়াম্মার গাদ্দাফির অত্যন্ত প্রভাবশালী পুত্র ও একসময়ের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী সাইফ আল-ইসলাম গাদ্দাফিকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) লিবিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ‘লিবিয়ান নিউজ এজেন্সি’ (LANA) এই চাঞ্চল্যকর খবরটি নিশ্চিত করেছে। ৫৩ বছর বয়সী সাইফের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে উত্তর আফ্রিকার যুদ্ধবিধ্বস্ত এই দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে অস্থিরতার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ঘাতক দলের নিশানায় ‘সংস্কারপন্থী’ গাদ্দাফিপুত্র সাইফ আল-ইসলামের রাজনৈতিক দলের প্রধান আনুষ্ঠানিকভাবে এই মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করলেও ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ নিয়ে এখনো রহস্যাবৃত পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি-কে (AFP) দেওয়া এক বিবৃতিতে সাইফের আইনজীবীরা দাবি করেছেন, চার সদস্যের একটি উচ্চপ্রশিক্ষিত ‘কমান্ডো ইউনিট’ (Commando Unit) লিবিয়ার জিনতান শহরে তার বাসভবনে অতর্কিত হামলা চালায়। সেই অভিযানেই গুলিতে প্রাণ হারান তিনি। তবে এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে নির্দিষ্ট কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী বা বিদেশি শক্তির হাত রয়েছে কি না, তা নিয়ে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
মৃত্যুর স্থান নিয়ে দানা বাঁধছে রহস্য আইনজীবীরা জিনতান শহরে হামলার কথা বললেও সাইফের বোন ভিন্ন দাবি করেছেন। লিবিয়ার একটি স্থানীয় টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, সাইফ আল-ইসলাম আলজেরিয়া সীমান্তবর্তী এলাকায় ঘাতকদের কবলে পড়েন। একই সময়ে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে মৃত্যুর দাবি আসায় এই হাই-প্রোফাইল হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত ঘটনা নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে। দেশটির বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কিংবা নিরাপত্তা বাহিনীর পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বিশ্লেষণ পাওয়া যায়নি।
লিবিয়ার কূটনীতি থেকে ‘আরব বসন্তের’ দহন ১৯৭২ সালে জন্ম নেওয়া সাইফ আল-ইসলাম ছিলেন গাদ্দাফি সরকারের সবচেয়ে আধুনিক ও মেধাবী মুখ। ২০০০ সালের পরবর্তী সময়ে লিবিয়ার সাথে পশ্চিমা বিশ্বের বৈরী সম্পর্ক উন্নয়নের মূল কারিগর ছিলেন তিনি। তার সক্রিয় উদ্যোগেই লিবিয়া তাদের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি (Nuclear Program) ত্যাগ করে, যার ফলে আন্তর্জাতিক মহলের নিষেধাজ্ঞা (Sanctions) তুলে নেওয়া হয়। সে সময় আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা তাকে লিবিয়ার আগামীর ‘সংস্কারপন্থী নেতা’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।
তবে ২০১১ সালে ‘আরব বসন্তের’ (Arab Spring) প্রভাবে গাদ্দাফি শাসনের পতন ঘটলে দৃশ্যপট আমূল বদলে যায়। তার বিরুদ্ধে তখন আন্দোলন দমনে সহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ আনা হয়। গাদ্দাফির মৃত্যুর পর জিনতান ভিত্তিক একটি মিলিশিয়া গোষ্ঠী তাকে আটক করে এবং দীর্ঘ ছয় বছর তিনি সেখানে বন্দি ছিলেন।
বিচারহীনতা ও রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের শেষ অধ্যায় ২০১৫ সালে লিবিয়ার একটি আদালত তার অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে। একই সময়ে ‘দ্য হেগ’-এ অবস্থিত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (International Criminal Court - ICC) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে তাকে বিচারের মুখোমুখি করার জন্য পরোয়ানা জারি করে। জীবনের দীর্ঘ সময় অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটালেও ২০২১ সালে তিনি পুনরায় রাজনীতিতে ফেরার ঘোষণা দেন। ওই বছর লিবিয়ার ‘প্রেসিডেনশিয়াল ইলেকশন’ (Presidential Election)-এ প্রার্থী হওয়ার মনোনয়ন দাখিল করে চমক সৃষ্টি করেছিলেন তিনি। যদিও শেষ পর্যন্ত সেই নির্বাচন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত হয়ে যায়।
সাইফ আল-ইসলাম সবসময় বলতেন, “ক্ষমতা কোনো উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তি নয়।” তবে তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে লিবিয়ার ‘গাদ্দাফি অধ্যায়’-এর সবচেয়ে শক্তিশালী উত্তরাধিকারের অবসান ঘটল। ভূ-রাজনৈতিক (Geopolitics) প্রেক্ষাপটে এই হত্যাকাণ্ড লিবিয়ার ভঙ্গুর শান্তি প্রক্রিয়াকে কতটা চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।