বিশ্ববিখ্যাত ভাষাবিদ ও চিন্তাবিদ নোয়াম চমস্কিকে মনে করা হয় আধুনিক বিশ্বের অন্যতম ‘বিবেক’। কিন্তু মার্কিন বিচার বিভাগের (Department of Justice) প্রকাশ করা সর্বশেষ ৩০ লাখেরও বেশি নথি সেই ভাবমূর্তিতে এক বড়সড় আঘাত হেনেছে। কুখ্যাত যৌন অপরাধী ও নারী পাচারকারী জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে চমস্কির গভীর ও নিয়মিত যোগাযোগের তথ্য এখন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের কেন্দ্রবিন্দুতে। নথিতে দেখা গেছে, কেবল একাডেমিক আলাপ নয়, বরং নিজের বিরুদ্ধে ওঠা যৌন নিপীড়নের অভিযোগ সামাল দিতেও চমস্কির কাছ থেকে পরামর্শ নিতেন এপস্টেইন।
এপস্টেইনের ‘সংকট ব্যবস্থাপক’ চমস্কি?
২০১৯ সালের জুলাইয়ে গ্রেফতার হওয়ার আগে যখন জেফরি এপস্টেইনের অন্ধকার জগত নিয়ে ‘মায়ামি হেরাল্ড’ একের পর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করছিল, তখন বিচলিত এপস্টেইন দ্বারস্থ হয়েছিলেন নোয়াম চমস্কির। ইমেইল চালাচালিতে দেখা যায়, এপস্টেইন জানতে চেয়েছিলেন—সংবাদমাধ্যমের এই ঝড় সামলাতে তিনি কি আত্মপক্ষ সমর্থন করবেন নাকি চুপ থাকবেন?
এর জবাবে চমস্কি যা লিখেছিলেন, তা অনেককেই অবাক করেছে। চমস্কি পরামর্শ দেন বিষয়টি স্রেফ ‘উপেক্ষা’ করার জন্য। চমস্কির মতে, সে সময় নারীদের প্রতি সহিংসতা নিয়ে এক ধরনের ‘হিস্ট্রিয়া’ (Hysteria) বা উন্মাদনা তৈরি হয়েছিল, যেখানে কোনো অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন তোলাকেও খুনের চেয়ে বড় অপরাধ হিসেবে দেখা হচ্ছিল। প্রখ্যাত এই চিন্তাবিদ এপস্টেইনকে আশ্বস্ত করে লিখেছিলেন, সংবাদমাধ্যম মূলত প্রতিক্রিয়া চায় যাতে তারা বিষোদ্গার করার সুযোগ পায়।
পারিবারিক ও আর্থিক লেনদেনের গভীরতা
প্রকাশিত এই ডকুমেণ্ট বা নথিতে উঠে এসেছে চমস্কি দম্পতির সঙ্গে এপস্টেইনের ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতার চিত্রও। চমস্কির স্ত্রী ও মুখপাত্র ভ্যালেরিয়া চমস্কিও এপস্টেইনের সঙ্গে নিয়মিত ইমেইল আদান-প্রদান করতেন। এমনকি নিজেদের সন্তানদের কাছে লেখা চিঠি বা পারিবারিক আর্থিক বিনিয়োগের (Financial Investment) বিষয়েও তাঁরা এপস্টেইনের ওপর গভীর আস্থা রাখতেন। ২০১৭ সালের একটি ইমেইলে ভ্যালেরিয়া লিখেছিলেন, “আমরা আপনাকে বিশ্বাস করি, তাই নির্দ্বিধায় পরামর্শ দিন।”
উল্লেখ্য, এর আগেও জানা গিয়েছিল যে এপস্টেইন ও চমস্কির মধ্যে দীর্ঘদিনের সখ্য ছিল এবং চমস্কি এপস্টেইনের বাড়িতে অতিথি হিসেবেও থেকেছেন। তবে নতুন এই নথিগুলো প্রমাণ করছে যে, সেই সম্পর্ক কেবল সাধারণ পরিচয়ের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল না।
প্রভাবশালী ব্যক্তিদের তালিকায় চমস্কি
মার্কিন বিচার বিভাগের এই মেগা রিলিজে কেবল চমস্কি নন, বরং ডনাল্ড ট্রাম্প, বিল ক্লিনটন, ইলন মাস্ক এবং বিল গেটসের মতো টেক জায়ান্ট (Tech Giant) ও বিশ্বনেতাদের নামও রয়েছে। তবে চমস্কির মতো একজন নৈতিক অভিভাবকের নাম এই তালিকায় আসা এবং যৌন নিপীড়নের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে তাঁর বিতর্কিত অবস্থান জনমনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। নথিতে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, নাম থাকা মানেই সরাসরি অপরাধ নয়, তবে এপস্টেইনের নেটওয়ার্ক কতটা গভীরে ছিল এটি তারই প্রমাণ।
বিজয় প্রসাদের ‘লজ্জা ও ঘৃণা’
চমস্কির দীর্ঘদিনের সহ-লেখক এবং প্রখ্যাত সাংবাদিক বিজয় প্রসাদ এই ঘটনায় নিজের ক্ষোভ চেপে রাখতে পারেননি। ট্রাইকন্টিনেন্টাল ইনস্টিটিউট ফর সোশ্যাল রিসার্চ-এর পরিচালক বিজয় প্রসাদ জানান, চমস্কির সঙ্গে দুটি বই লিখলেও তিনি কখনও এই গোপন সখ্যের কথা জানতেন না।
বিজয় প্রসাদ এক চিঠিতে বলেন, “আমি এপস্টেইনের শিশু যৌন নিপীড়নের বিষয়টি দেখে প্রচণ্ড ঘৃণা অনুভব করছি। নোয়াম তাঁর সঙ্গে এমন সখ্য রাখায় আমি লজ্জিত। এই ন্যক্কারজনক ঘটনার কোনো অজুহাত বা প্রেক্ষাপট হতে পারে না।”
চমস্কির বর্তমান অবস্থা ও পূর্বের স্বীকারোক্তি
বর্তমানে ৯৭ বছর বয়সি নোয়াম চমস্কি অত্যন্ত অসুস্থ এবং ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে কথা বলা বা লেখার অবস্থায় নেই। মৃত্যুর কয়েক বছর আগে চমস্কি অবশ্য এপস্টেইনের সঙ্গে সম্পর্কের কথা স্বীকার করেছিলেন, তবে তখন তিনি দাবি করেছিলেন সেই সম্পর্ক ছিল মূলত ‘আর্থিক ও ব্যক্তিগত’। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে তিনি বলেছিলেন, “এটি কারও ব্যক্তিগত বিষয় নয়, আমি তাঁকে চিনতাম এবং মাঝে মাঝে দেখা হতো।”
জেফরি এপস্টেইনের সেই রহস্যময় জীবনের অন্ধকার অধ্যায়গুলো একের পর এক উন্মোচিত হচ্ছে, আর তার সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে চমস্কির মতো আইকনিক ব্যক্তিত্বদের নাম, যা বিশ্বজুড়ে একাডেমিক ও রাজনৈতিক মহলে নতুন এক নৈতিক সংকটের জন্ম দিয়েছে।