বিশ্বকাপ ক্রিকেট ইতিহাসে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ মানেই বাড়তি উত্তেজনা, গ্যালারি ঠাসা দর্শক আর কোটি কোটি টাকার বিজ্ঞাপনী লগ্নি। তবে এবারের আসরে এই হাই-ভোল্টেজ ম্যাচটি নিয়ে তৈরি হওয়া ধোঁয়াশা কাটাতে অবশেষে সরাসরি ময়দানে নেমেছে বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসি (ICC)। লাহোরে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (PCB) প্রধান মহসিন নাকভির সঙ্গে আইসিসির ডেপুটি চেয়ারম্যান ইমরান খাজার দীর্ঘ রুদ্ধদ্বার বৈঠকের পর ক্রিকেট বিশ্বে নতুন গুঞ্জন শুরু হয়েছে। পিসিবি ভারতের বিপক্ষে ১৫ ফেব্রুয়ারির ম্যাচে মাঠে নামার ব্যাপারে কিছুটা নমনীয় হলেও, টেবিলে ছুড়ে দিয়েছে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর শর্ত।
রেভিনিউ হারানোর ভয়? সুর নরম করল আইসিসি গত কয়েক দিন ধরে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোতে পাকিস্তানকে একঘরে করে দেওয়া কিংবা বড় অঙ্কের আর্থিক জরিমানার (Financial Penalty) যে হুমকি শোনা যাচ্ছিল, আইসিসির শীর্ষ কর্তাদের পাকিস্তান সফর প্রমাণ করল তার বাস্তব ভিত্তি আদতে ক্ষীণ। মূলত ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ বাতিল হলে যে বিশাল অংকের রাজস্ব বা রেভিনিউ (Revenue) হারানোর ঝুঁকি রয়েছে, তা সামাল দিতেই লাহোরে পিসিবি চেয়ারম্যানের দ্বারস্থ হয়েছে আইসিসি। এই সংকটকালীন বৈঠকে আইসিসি ও পিসিবি-র পাশাপাশি বিশেষ আমন্ত্রণে যোগ দিয়েছিলেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (BCB) সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুলও।
নাকভির ‘মাস্টারস্ট্রোক’: দ্বিপাক্ষিক সিরিজ ও নতুন শর্ত পাকিস্তানি গণমাধ্যমগুলোর দাবি অনুযায়ী, পিসিবি চেয়ারম্যান মহসিন নাকভি কেবল বিশ্বকাপ খেলা নিয়েই আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি পরিষ্কার জানিয়েছেন, ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ খেলতে হলে পাকিস্তানকেও যোগ্য সম্মান ও বাণিজ্যিক সুবিধা দিতে হবে। পিসিবির দেওয়া প্রধান শর্তগুলো হলো:
১. দ্বিপাক্ষিক সিরিজের পুনঃসূচনা: দীর্ঘকাল বন্ধ থাকা ভারত-পাকিস্তান দ্বিপাক্ষিক সিরিজ (Bilateral Series) আবারও শুরু করার আনুষ্ঠানিক নিশ্চয়তা দিতে হবে। ২. আইসিসি রেভিনিউ শেয়ারিং: আইসিসির আয়ের লভ্যাংশ বা রেভিনিউ মডেল থেকে পাকিস্তানের প্রাপ্য অংশ আরও বাড়ানোর দাবি জানানো হয়েছে। ৩. বিসিবির ক্ষতিপূরণ: হ্যান্ডশেক বিতর্ক ও বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়ায় বাংলাদেশের যে আর্থিক ও সম্মানহানি হয়েছে, তার জন্য আইসিসিকে মোটা অঙ্কের ক্ষতিপূরণ (Financial Compensation) নিশ্চিত করতে হবে। ৪. আয়োজক স্বত্ব: বিসিবিকে ২০২৮ সালের অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের একক আয়োজক স্বত্ব (Hosting Rights) প্রদানের দাবিও তুলেছে পাকিস্তান।
হ্যান্ডশেক বিতর্ক ও খেলোয়াড়ি সুলভ আচরণ রাজনৈতিক তিক্ততা সরিয়ে মাঠের লড়াইয়ে স্পোর্টিং স্পিরিট বা খেলোয়াড়ি সুলভ আচরণ বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে পিসিবি। বৈঠকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, ম্যাচ শেষে ক্রিকেটারদের প্রথাগতভাবে হাত মেলানো বা হ্যান্ডশেক (Handshake) করার বিষয়টি বাধ্যতামূলক করতে হবে, যাতে মাঠের বাইরের রাজনীতি খেলার পরিবেশ নষ্ট করতে না পারে।
সিদ্ধান্তের বল এখন আইসিসির কোর্টে পিসিবির এই দাবিগুলো আইসিসি এবং ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (BCCI) কতটুকু মেনে নেবে, তার ওপরই নির্ভর করছে ১৫ ফেব্রুয়ারির মহারণের ভাগ্য। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিশ্বকাপের বৃহত্তর স্বার্থে এবং সম্প্রচারকারী সংস্থাগুলোর বাণিজ্যিক চাপ সামলাতে আইসিসি হয়তো পাকিস্তানের শর্তগুলোর বেশিরভাগই মেনে নেওয়ার পথে হাঁটবে। আপাতত ক্রিকেট বিশ্বের নজর এখন প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের চূড়ান্ত নির্দেশনার দিকে, যা আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই আসার কথা রয়েছে।