মালদ্বীপের থিলাফুশি আইল্যান্ডে নিখোঁজ হওয়ার দুই দিন পর এক প্রবাসী বাংলাদেশির মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। নিহত যুবকের নাম আমিন মিয়া (২৪), যিনি ওই দ্বীপে পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। এই মর্মান্তিক ঘটনায় এক শ্রীলঙ্কান নাগরিককে গ্রেফতার করেছে স্থানীয় প্রশাসন এবং আদালত তাকে দীর্ঘমেয়াদী রিমান্ডে পাঠিয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে কর্মক্ষেত্রে চরম গাফিলতি ও নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘনের ভয়াবহ চিত্র।
নিখোঁজ থেকে মরদেহ উদ্ধার: দুই দিনের রহস্য স্থানীয় পুলিশ ও গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, গত ২৬ জানুয়ারি আমিন মিয়া তার কর্মস্থল থেকে আকস্মিক নিখোঁজ হন। তার সহকর্মী ও পরিচিতরা বিভিন্ন স্থানে সন্ধান চালিয়েও ব্যর্থ হলে স্থানীয় থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়। নিখোঁজের দুই দিন পর, ২৮ জানুয়ারি থিলাফুশি আইল্যান্ডের একটি ময়লার স্তূপের গভীর থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
সিসিটিভি ফুটেজে মৃত্যুর রোমহর্ষক দৃশ্য তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আইল্যান্ডটির বর্জ্য অপসারণে ব্যবহৃত একটি ভারী এক্সক্যাভেটর (Excavator) বা খননকারী যন্ত্রের আঘাতেই আমিন মিয়ার মৃত্যু হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ (CCTV Footage) বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ৩২ বছর বয়সী শ্রীলঙ্কান নাগরিক হেশান মাদুরাঙ্গা দিশানায়েক মেনিকা যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন না করেই যন্ত্রটি পরিচালনা করছিলেন। ফুটেজে স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে যে, এক্সক্যাভেটরের শক্তিশালী বাহুর আঘাতে আমিন মিয়া গুরুতর আহত হয়ে ময়লার স্তূপের মধ্যে পড়ে যান। মর্মান্তিক বিষয় হলো, আঘাতের পর কাজ বন্ধ না করে অভিযুক্ত চালক বর্জ্য সরানোর কাজ চালিয়ে যান, যার ফলে আমিন মিয়া জ্যান্ত চাপা পড়েন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অভিযুক্ত শ্রীলঙ্কান নাগরিক রিমান্ডে এই ঘটনায় অভিযুক্ত হেশান মাদুরাঙ্গাকে তাৎক্ষণিক গ্রেফতার করে মালদ্বীপের ফৌজদারি আদালতে হাজির করা হয়। আদালত তার বিরুদ্ধে ‘ইচ্ছাকৃত হত্যা’র (Intentional Murder) প্রাথমিক অভিযোগ আমলে নিয়ে প্রথমে সাত দিনের এবং পরবর্তীতে আরও ১০ দিনের রিমান্ড (Remand) মঞ্জুর করেন। তদন্ত কর্মকর্তারা খতিয়ে দেখছেন যে, চালক আমিন মিয়ার পড়ে যাওয়ার বিষয়টি জানার পরও কেন কাজ চালিয়ে গিয়েছিলেন এবং এটি নিছক দুর্ঘটনা নাকি এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল।
প্রবাসীদের ক্ষোভ ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন আমিন মিয়ার এই মর্মান্তিক মৃত্যু মালদ্বীপে বসবাসরত কয়েক হাজার প্রবাসী বাংলাদেশির মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। দেশটির মানবাধিকার সংগঠনগুলো কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা বা ওয়ার্কপ্লেস সেফটি (Workplace Safety) নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। অভিযোগ উঠেছে যে, আমিন মিয়া নিখোঁজ হওয়ার পর তাৎক্ষণিকভাবে আইল্যান্ডজুড়ে বড় ধরনের তল্লাশি চালানো হলে হয়তো তাকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হতো। স্থানীয় প্রশাসনের অবহেলাকেও এই মৃত্যুর জন্য দায়ী করছেন অনেকে।
হাইকমিশনের তৎপরতা ও প্রত্যাবাসন মালদ্বীপে নিযুক্ত বাংলাদেশ হাইকমিশন বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে। হাইকমিশনের কল্যাণ সহকারী মো. জসিম উদ্দিন জানিয়েছেন, তারা আমিন মিয়ার মরদেহ পরিদর্শন করেছেন এবং স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। নিহতের মরদেহ দ্রুত বাংলাদেশে পাঠানোর বা রিপ্যাট্রিয়েশন (Repatriation)-এর জন্য যাবতীয় আইনি প্রক্রিয়া ও দাপ্তরিক কাজ দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করা হচ্ছে।
হাইকমিশনার এই ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন এবং নিহতের পরিবার যেন ন্যায়বিচার ও উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ পায়, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। মালদ্বীপের এই ঘটনা আবারও প্রবাসী শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রে জীবনের ঝুঁকি ও নিরাপত্তার অভাবকে আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনায় নিয়ে এসেছে।