অবশেষে যবনিকা পতন ঘটেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (BCB), বিসিসিআই, পিসিবি এবং আইসিসির মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী ও নাটকীয় টানাপোড়েনের। আসন্ন বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়ে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, তার সমাধান হয়েছে আর্থিক ক্ষতিপূরণের (Compensation) মাধ্যমে। তবে এই পুরো বিষয়টিকে ক্রিকেটের অভিভাবক সংস্থা আইসিসির (ICC) চরম প্রশাসনিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক মোহাম্মদ হাফিজ। তার মতে, পর্দার আড়ালে ঘটা এই ভুলের জন্য আইসিসির উচিত প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়া।
চতুর্মুখী নাটকীয়তা ও বাংলাদেশের অনড় অবস্থান
ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের (BCCI) নির্দেশে আইপিএল থেকে মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়ার পর। নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক জটিলতার অজুহাতে ভারতে বিশ্বকাপ খেলতে দল পাঠাতে অস্বীকৃতি জানায় বাংলাদেশ। বিসিবি ম্যাচগুলো নিরপেক্ষ ভেন্যুতে (Neutral Venue) সরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ জানালেও আইসিসি তা প্রত্যাখ্যান করে এবং তড়িঘড়ি করে বাংলাদেশের পরিবর্তে স্কটল্যান্ডকে মূল পর্বে অন্তর্ভুক্ত করে।
এই অচলাবস্থা (Stalemate) নিরসনে গত রোববার লাহোরে পিসিবি প্রধান মহসিন নাকভি এবং বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুলের সঙ্গে আইসিসি প্রতিনিধি দলের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশ বিশ্বকাপ না খেললেও বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণ পাবে। মূলত পাকিস্তানের শক্ত অবস্থানের কারণেই আইসিসি এই অর্থ দিতে বাধ্য হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
আইসিসির প্রশাসনিক ব্যর্থতা নিয়ে হাফিজের প্রশ্ন
পাকিস্তানের একটি টেলিভিশন চ্যানেলে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মোহাম্মদ হাফিজ পুরো পরিস্থিতির জন্য সরাসরি আইসিসিকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন। তিনি মনে করেন, আইসিসি পরিস্থিতি সামলাতে না পারায় ক্রিকেট বিশ্বের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়েছে।
হাফিজ বলেন, "গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ক্রিকেটের মাঠে যে রাজনীতির খেলা চলল, তার দায়ভার কার? বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশি, পাকিস্তানি কিংবা ইংলিশ ভক্তরা—সবাই এই সিদ্ধান্তে মর্মাহত। আমার প্রশ্ন হলো, ভুলটা কার ছিল? যদি কোনো ভুল না-ই হয়ে থাকে, তবে কেন এই বিশাল অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হচ্ছে? ক্ষতিপূরণ দেওয়ার অর্থই হলো অপরাধ স্বীকার করা। তবে কেন তারা জনসমক্ষে ভুল স্বীকার করছে না?"
রাজনীতি বনাম ক্রিকেট: ‘স্পিরিট অব ক্রিকেট’ নিয়ে সংশয়
আইসিসি প্রায়ই 'গেম অব ইন্টিগ্রিটি' বা ক্রিকেটের শুদ্ধতা রক্ষার বুলি আওড়ায়। হাফিজ এই বিষয়টিকেই আক্রমণ করে বলেন, "তারা যদি সত্যিই খেলার চেতনা (Spirit of Cricket) রক্ষা করতে চাইত, তবে পরিস্থিতি এই পর্যায়ে পৌঁছাতে পারত না। এটি আইসিসি ও তাদের প্রশাসনের সম্পূর্ণ ব্যর্থতা। আজ বাংলাদেশকে ক্ষতিপূরণ দিয়ে মুখ বন্ধ করা হচ্ছে বা কোনো নিষেধাজ্ঞা থেকে সুরক্ষা দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু পর্দার আড়ালে যারা এই নেতিবাচক ভূমিকা পালন করেছে, তাদের নাম প্রকাশ করা উচিত।"
হাফিজ আরও যোগ করেন, যদি এই ধরণের প্রশাসনিক অস্বচ্ছতা চলতে থাকে, তবে ভবিষ্যতে আরও বড় সংকটের সৃষ্টি হবে। ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ আয়োজনের গুরুত্ব যেমন অনস্বীকার্য, তেমনি প্রতিটি পূর্ণ সদস্য দেশের সম্মান রক্ষা করাও আইসিসির নৈতিক দায়িত্ব।
জবাবদিহিতার দাবি ও ভবিষ্যৎ শঙ্কা
সাবেক এই পাক তারকার মতে, আইসিসি যদি এখন ভুল স্বীকার না করে, তবে ক্রিকেটে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ আরও বাড়বে। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের প্রাপ্য ক্ষতিপূরণ পাওয়া একটি ইতিবাচক দিক হলেও আইসিসির উচিত ছিল একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করা। যদি এই ধরণের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে, তবে ক্রিকেটের বৈশ্বিক মার্কেট ভ্যালু (Market Value) এবং দর্শকপ্রিয়তা—উভয়ই দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে।
ক্রিকেট মহলের মতে, হাফিজের এই সাহসী মন্তব্য আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অঙ্গনে আইসিসির বর্তমান নীতি ও স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিল।