ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে এক বিরল ও অনুপ্রেরণাদায়ক দৃশ্যের অবতারণা হয়েছে। বয়সের ভারে শরীর নুয়ে পড়লেও নাগরিক দায়িত্ব পালনের অদম্য ইচ্ছার কাছে হার মেনেছে বার্ধক্য। নাতির কাঁধে চড়ে ভোটকেন্দ্রে এসে নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন ১২০ বছর বয়সি তৈয়বজান। বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) ময়মনসিংহ-১ (হালুয়াঘাট-ধোবাউড়া) আসনের এই চিত্রটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বার্ধক্যকে হার মানানো অদম্য ইচ্ছা
সকাল ১০টার দিকে হালুয়াঘাটের ধারা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে যখন তৈয়বজানকে তার নাতি কাঁধে করে নিয়ে আসেন, তখন উপস্থিত ভোটার ও নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে এক ধরণের বিস্ময় ও শ্রদ্ধার আবহ তৈরি হয়। দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এলেও পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র ভুল করেননি এই শতায়ু বৃদ্ধা।
ভোট প্রদান শেষে এক গাল হাসি নিয়ে তৈয়বজান বলেন, “নিজে চলাফেরা করতে পারি না, তাও আইছি। নিজ হাতে পছন্দের মানুষরে ভোট দিছি, খুব ভালো লাগতাছে।” তার এই তৃপ্তিবোধ কেবল একটি ব্যক্তিগত অনুভূতি নয়, বরং দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষের গভীর আস্থার প্রতিফলন।
ভোটের পরিসংখ্যান ও শৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা
ধারা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ হাজার ৩০৫ জন। প্রিজাইডিং কর্মকর্তা মুহাম্মদ মোজাহারুল হক জানান, সকাল থেকেই ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রথম দুই ঘণ্টায় ৫৯৮ জন ভোটার তাদের রায় প্রদান করেছেন। কেন্দ্রে ভোটারদের সুবিধার্থে সুশৃঙ্খল বিন্যাস করা হয়েছিল; নারী ভোটারদের জন্য নিচতলায় এবং পুরুষ ভোটারদের জন্য দোতলায় বুথ (Voting Booth) স্থাপন করা হয়।
দীর্ঘ ১৬-১৭ বছর পর সরাসরি নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পেরে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা লক্ষ্য করা গেছে। অনেক শারীরিক প্রতিবন্ধী ভোটারকেও স্বজনদের সহায়তায় কিংবা ক্র্যাচে ভর দিয়ে কেন্দ্রে আসতে দেখা যায়, যা এই নির্বাচনের গণমুখী চরিত্রকে ফুটিয়ে তোলে।
প্রার্থীদের পর্যবেক্ষণ ও ডিজিটাল ডাটা নিয়ে অভিযোগ
নির্বাচনী পরিবেশ পর্যবেক্ষণে এদিন কেন্দ্রে আসেন ‘ঘোড়া’ প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী সালমান ওমর রুবেল। তিনি সার্বিক নিরাপত্তায় সন্তোষ প্রকাশ করলেও ভোটগ্রহণের গতি কিছুটা মন্থর (Slow Voting Speed) বলে অভিযোগ করেন। তিনি মনে করেন, ভোট প্রদানের এই ধীরগতি সাধারণ ভোটারদের জন্য বিড়ম্বনার কারণ হতে পারে।
অন্যদিকে, ‘ধানের শীষ’ প্রতীকের প্রার্থী সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স এক ভিন্নধর্মী অভিযোগ তুলেছেন। তিনি জানান, অনেক ভোটার নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত ডিজিটাল অ্যাপ (Digital App) থেকে তথ্য সংগ্রহ করে কেন্দ্রে আসলেও তালিকায় নাম না থাকায় ভোট দিতে পারছেন না। তার মতে, অ্যাপে তথ্য প্রদর্শন করা সত্ত্বেও কেন্দ্রে নাম না থাকাটা একটি বড় ধরণের যান্ত্রিক ত্রুটি বা বিড়ম্বনা, যা ভোটারদের নিরুৎসাহিত করতে পারে।
প্রশাসন ও নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এ ধরণের অভিযোগ খতিয়ে দেখে দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন। সব মিলিয়ে ময়মনসিংহ-১ আসনে তৈয়বজানের মতো প্রবীণদের অংশগ্রহণ তরুণ প্রজন্মের জন্য এক বিশেষ বার্তা বহন করছে—ভোটাধিকার কেবল একটি আইনি প্রক্রিয়া নয়, এটি নাগরিকত্বের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রকাশ।