ইউরোপের অন্যতম জনপ্রিয় গন্তব্য ইতালিতে অবৈধভাবে প্রবেশের পথ চিরতরে বন্ধ করতে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছে দেশটির বর্তমান কট্টর ডানপন্থি সরকার। জর্জিয়া মেলোনির নেতৃত্বাধীন প্রশাসন সম্প্রতি একটি নতুন অভিবাসন আইনের খসড়া অনুমোদন করেছে, যেখানে সাগরপথে অবৈধভাবে আসা অভিবাসীদের সরাসরি বহিষ্কারসহ একাধিক কঠোর পদক্ষেপের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালিতে পৌঁছানো অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ভবিষ্যৎ চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়ল।
নৌ-অবরোধ ও ৫০ হাজার ইউরো জরিমানার কঠোর বিধান
ইতালির নতুন এই অভিবাসন নীতিতে জাতীয় নিরাপত্তাকে (National Security) সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। খসড়া আইনে বলা হয়েছে, ভূমধ্যসাগরে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের উদ্ধারকারী বেসরকারি জাহাজগুলোর কার্যক্রম সীমিত করতে প্রয়োজনে ‘অস্থায়ী নৌ-অবরোধ’ (Naval Blockade) দেওয়া হবে। এছাড়া কোনো জাহাজ যদি সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইতালির জলসীমায় প্রবেশ করে, তবে সংশ্লিষ্ট পক্ষকে ৫০ হাজার ইউরো পর্যন্ত বড় অংকের জরিমানার (Heavy Fine) মুখোমুখি হতে হবে।
সরকারের নতুন এই কৌশলের মূল উদ্দেশ্য হলো ‘হিউম্যান ট্রাফিকিং’ বা মানবপাচার রোধ করা এবং সাগরপথে আসা অভিবাসীদের ইতালিতে স্থায়ী হতে না দেওয়া। প্রস্তাবিত আইনে আরও বলা হয়েছে, সাগরপথে কেউ প্রবেশ করলেই তাকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বহিষ্কার (Deportation) করা হবে এবং প্রয়োজনে তৃতীয় কোনো নিরাপদ দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। আইনটি বর্তমানে ইতালির সংসদের নিম্ন কক্ষ ও সিনেটে চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
মৃত্যুর মিছিল ও আইওএম-এর উদ্বেগজনক তথ্য
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (IOM)-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ভূমধ্যসাগর এখন বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক অভিবাসন রুট হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। সংস্থাটি জানায়, ২০২৫ সালের প্রথম মাস জানুয়ারিতেই অন্তত ৩৭৫ জন অভিবাসনপ্রত্যাশী নিখোঁজ বা মৃত্যুবরণ করেছেন। ফেব্রুয়ারির প্রথম ১০ দিনের মধ্যেই এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫২৪ জনে। আইওএম ধারণা করছে, সাগরে নিখোঁজ হওয়ার অনেক ঘটনা নথিবদ্ধ না হওয়ায় প্রকৃত মৃতের সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে। গত বছরও প্রায় ১৩০০-এর বেশি মানুষ এই পথ পাড়ি দিতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন।
ঝুঁকিপূর্ণ পথে বাংলাদেশিদের স্রোত
উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ইতালিতে বৈধভাবে শ্রমিক নেওয়ার প্রক্রিয়া বা ‘লিগ্যাল প্রসেস’ (Legal Process) চালু থাকা সত্ত্বেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশি অবৈধ পথে দেশটিতে প্রবেশের চেষ্টা করছেন। পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত সাগরপথ পাড়ি দিয়ে ৭৫৯ জন বাংলাদেশি ইতালিতে প্রবেশ করেছেন। এই বিপজ্জনক যাত্রায় লিবিয়া থেকে যাত্রা শুরু করা অনেক নৌকাডুবির ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন অনেক বাংলাদেশি তরুণ।
প্রবাসী কমিউনিটির সতর্কবার্তা
ইতালিতে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা এই হঠকারী ও বিপজ্জনক পথ পরিহার করার জন্য দেশের তরুণ সমাজের প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন। তারা বলছেন, উন্নত জীবনের আশায় লিবিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়া মানে নিশ্চিত মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা। অনেক ক্ষেত্রে সর্বস্ব হারিয়েও শেষ রক্ষা হচ্ছে না। জীবনই যদি না থাকে, তবে এমন অভিবাসনের কোনো সার্থকতা নেই। বর্তমানে ইতালির যে কঠোর রাজনৈতিক পরিবেশ, তাতে অবৈধভাবে আসার চেষ্টা হিতে বিপরীত হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
ইতালির এই নতুন আইনের ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতেও অভিবাসন নিয়ে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। মানবাধিকার কর্মীরা এই আইনের সমালোচনা করলেও, মেলোনি সরকার তার ‘জিরো টলারেন্স’ (Zero Tolerance) নীতিতে অটল রয়েছে।