মিরপুর শের-ই বাংলা স্টেডিয়ামের গ্যালারি তখন উত্তেজনায় ফুটছে। শেষ ওভারের নাটকীয়তা, রিশাদ হোসেনের বলে শাহিন শাহ আফ্রিদির ক্যাচ মিস এবং পরক্ষণেই স্টাম্পিং—সব মিলিয়ে এক রূদ্ধশ্বাস সমাপ্তি। শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের ইনিংস থামল ২৭৯ রানে। ১১ রানের রোমাঞ্চকর জয়ে ২-১ ব্যবধানে সিরিজ নিজেদের করে নিল বাংলাদেশ। ২০১৫ সালের পর ঘরের মাঠে আবারও পাকিস্তানের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ জয়ের গৌরব অর্জন করল লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা।
তানজিদ তামিমের সেঞ্চুরি ও লড়াকু সংগ্রহ সিরিজ নির্ধারণী বা ‘Series Decider’ ম্যাচে টসে হেরে ব্যাটিংয়ে নেমে শুরু থেকেই আগ্রাসী মেজাজে ছিল বাংলাদেশ। দুই ওপেনার সাইফ হাসান ও তানজিদ হাসান তামিম মিলে গড়েন ১০৫ রানের দুর্দান্ত এক ‘Opening Stand’। সাইফ হাসান ৩৬ রানে বিদায় নিলেও এক প্রান্ত আগলে রেখে পাকিস্তানি বোলারদের শাসন করেন তানজিদ তামিম। তার নান্দনিক সব শটে ওয়ানডে ক্যারিয়ারের প্রথম ‘Maiden Century’ পূর্ণ করেন এই বাঁহাতি ওপেনার। ১০৭ বলে ৭টি ছক্কা ও ৬টি চারের বিনিময়ে ১০৭ রানের ইনিংস খেলে তিনি যখন মাঠ ছাড়েন, বাংলাদেশের স্কোর তখন ১৯৪।
মাঝপথে নাজমুল হোসেন শান্ত (২৭) এবং লিটন দাসের ৪১ রানের ইনিংসগুলো ইনিংসের ভিত শক্ত করে। তবে শেষ দিকে তাওহীদ হৃদয়ের অপরাজিত ৪৮ রানের লড়াকু ইনিংসে ভর করে নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৫ উইকেট হারিয়ে ২৯০ রানের চ্যালেঞ্জিং টার্গেট দাঁড় করায় বাংলাদেশ। পাকিস্তানের হয়ে হারিস রউফ ৩টি উইকেট শিকার করেন।
শুরুতেই পাকিস্তানের ব্যাটিং বিপর্যয় ২৯১ রানের লক্ষ্যে তাড়া করতে নেমে ইনিংসের শুরুতেই হোঁচট খায় পাকিস্তান। টাইগার পেসার তাসকিন আহমেদের গতিতে কুপোকাত হন শাহিবজাদা ফারহান। এরপর নাহিদ রানা ও মোস্তাফিজুর রহমানের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে মাত্র ১৭ রানেই ‘Top-order’-এর ৩ ব্যাটারকে হারিয়ে চরম বিপাকে পড়ে সফরকারীরা। চতুর্থ উইকেটে আব্দুল সামাদ ও গাজী ঘোরি ইনিংস মেরামতের চেষ্টা করলেও তাদের পঞ্চাশ রানের জুটি ভাঙেন নাহিদ রানা। ৮২ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে পাকিস্তান যখন হারের শঙ্কায়, তখনই হাল ধরেন অধিনায়ক সালমান আলী আগা।
সালমান আলী আগার লড়াই ও তাসকিনের তোপ অধিনায়ক সালমান আলী আগা একাই লড়াই চালিয়ে যান। তাকে যোগ্য সঙ্গ দেন সাদ মাসুদ (৭৯ বলে ৮২ রানের জুটি)। সালমান তার ওয়ানডে ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা ইনিংস খেলে দলকে জয়ের স্বপ্ন দেখাচ্ছিলেন। তবে ৪৮তম ওভারে বল করতে এসে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন তাসকিন আহমেদ। ৯৮ বলে ১০৬ রান করা সালমানকে নাজমুল হোসেন শান্তর ক্যাচ বানিয়ে প্যাভিলিয়নে ফেরত পাঠান তিনি। সালমানের বিদায়ে পাকিস্তানের জয়ের আশা ফিকে হয়ে যায়।
শেষ ওভারের ড্রামা ও ঐতিহাসিক সিরিজ জয় শেষ ওভারে জয়ের জন্য পাকিস্তানের প্রয়োজন ছিল ১২ রান। ক্রিজে ছিলেন বিধ্বংসী শাহিন শাহ আফ্রিদি। রিশাদ হোসেনের করা ওভারের দ্বিতীয় বলে শাহিন ক্যাচ তুললেও বোলার নিজেই তা তালুবন্দি করতে ব্যর্থ হন। তবে সেই ভুলের খেসারত দিতে হয়নি বাংলাদেশকে। শেষ বলে আফ্রিদি স্টাম্পড আউট হলে ১১ রানের জয় নিশ্চিত হয় টাইগারদের।
বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তাসকিন আহমেদ, তিনি নিয়েছেন ৪টি উইকেট। এছাড়া মোস্তাফিজুর রহমান ৩টি এবং নাহিদ রানা ২টি উইকেট নিয়ে জয়ের পথ প্রশস্ত করেন।
দীর্ঘ ১১ বছর পর পাকিস্তানের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে এই জয় বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে নতুন এক মাত্রা যোগ করল। ২০১৫ সালে পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ করার স্মৃতি যেন আবারও ফিরে এলো মিরপুরের সবুজ চত্বরে।