বিশ্বজুড়ে বিমান চলাচলের ইতিহাসে ২০২৬ সাল এক চরম অনিশ্চয়তার বছর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ইরান এবং ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান সামরিক সংঘাত কেবল মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে আটলান্টিক থেকে প্রশান্ত মহাসাগরের আকাশসীমায়। ভূ-রাজনৈতিক এই অস্থিরতার সরাসরি প্রভাব পড়ছে এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রিতে, যার ফলে আকাশছোঁয়া হতে যাচ্ছে বিমানের টিকিটের দাম।
তেলের বাজারে অগ্নিমূল্য ও এয়ারলাইন্সের দুশ্চিন্তা ইরান সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়েছে অপরিশোধিত তেলের (Crude Oil) বাজারে। বর্তমানে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারের গণ্ডি ছাড়িয়ে গেছে, যা গত চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। একটি এয়ারলাইন্সের মোট পরিচালন ব্যয়ের বা Operational Cost-এর প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশই খরচ হয় জ্বালানি বা Jet Fuel খাতে।
ইউনাইটেড এয়ারলাইন্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (CEO) স্কট কিরবি জানিয়েছেন, জ্বালানির এই অতিরিক্ত ব্যয় সামাল দিতে খুব দ্রুতই টিকিটের দাম বাড়ানো হতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম যে হারে বাড়ছে, গাণিতিক হিসাব অনুযায়ী যাত্রীদের টিকিটের দামও প্রায় একই অনুপাতে বৃদ্ধির জোরালো আশঙ্কা রয়েছে।
ফ্লাইট বাতিল ও রুটের পরিবর্তন এভিয়েশন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সিরিয়াম’ (Cirium)-এর তথ্যমতে, চলমান উত্তেজনার কারণে গত কয়েক সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে প্রায় ৫০ হাজার ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। নিরাপত্তার অভাব ও লোকসানের আশঙ্কায় অনেক জনপ্রিয় ও লাভজনক রুট বন্ধ করে দিচ্ছে বড় বড় এয়ারলাইন্স। যখন আকাশে ফ্লাইটের সংখ্যা বা সিটের জোগান কমে যায়, তখন বাজারে টিকিটের একটি কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়, যা প্রকারান্তরে ভাড়াকে আরও উসকে দেয়।
জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং আমেরিকান এয়ারলাইন্সের সাবেক নির্বাহী রব ব্রিটন বলেন, "জ্বালানির দাম বাড়তি থাকলে বিমানের ভাড়া বাড়া নিশ্চিত। এটি বোঝার জন্য রকেট সায়েন্স জানার প্রয়োজন নেই; শ্রমিকের বেতনের পর জ্বালানিই একটি এয়ারলাইন্সের দ্বিতীয় বৃহত্তম খরচ।"
বাজেট ক্যারিয়ারগুলোর অস্তিত্ব সংকট জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি কেবল ভাড়া বাড়াচ্ছে না, বরং অনেক ‘বাজেট ক্যারিয়ার’ বা কম খরচের বিমান সংস্থাকে দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে ফেলেছে। যেমন— স্পিরিট এয়ারলাইন্স (Spirit Airlines) ইতোমধ্যেই বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যদি এই সস্তা এয়ারলাইন্সগুলো বাজার থেকে সরে যায়, তবে প্রতিযোগিতার অভাব দেখা দেবে। ফলে বড় এয়ারলাইন্সগুলো একচেটিয়াভাবে (Monopoly) নিজেদের ইচ্ছামতো ভাড়া বাড়ানোর সুযোগ পাবে, যার চূড়ান্ত মাশুল দিতে হবে সাধারণ যাত্রীদের।
পরিস্থিতি সামাল দিতে এয়ারলাইন্সগুলোর কৌশল বিপজ্জনক এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশ্বজুড়ে বিমান সংস্থাগুলো বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে:
১. সরাসরি ভাড়া বৃদ্ধি: কোয়ান্টাস ও এয়ার নিউজিল্যান্ডের মতো সংস্থাগুলো ইতোমধ্যেই সরাসরি টিকিট প্রতি বাড়তি চার্জ আরোপ করেছে। ২. হেজিং (Hedging): লুফথানসা বা রায়ানএয়ার-এর মতো কিছু সংস্থা আগে থেকে নির্দিষ্ট দামে জ্বালানি কেনার চুক্তি বা Hedging করে রাখলেও বর্তমানে অস্থির বাজারে তা খুব একটা কাজে আসছে না। ৩. আধুনিকায়ন: জ্বালানি সাশ্রয় করতে অনেক সংস্থা ‘এ৩২১এক্সএলআর’ (A321XLR)-এর মতো আধুনিক বিমান যুক্ত করছে, যা পুরনো মডেলের চেয়ে ১০ শতাংশ কম জ্বালানি খরচ করে।
আসন্ন গ্রীষ্মকালীন ভ্রমণ ও যাত্রীদের জন্য পরামর্শ সামনে জুন-জুলাই মাসের গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে ভ্রমণের চাহিদা সর্বোচ্চ থাকে। এভিয়েশন বিশ্লেষক জ্যাক গ্রিফের মতে, যারা এই সময়ে ভ্রমণের পরিকল্পনা করছেন, তাদের উচিত এখনই টিকিট বুক করে রাখা। তবে বিশ্ব পরিস্থিতির অনিশ্চয়তা বিবেচনায় তিনি ‘রিফান্ডযোগ্য’ (Refundable) বা পরিবর্তনযোগ্য টিকিট কেনার পরামর্শ দিয়েছেন। এতে করে তেলের দাম কমলে বা পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে বড় আর্থিক লোকসান ছাড়াই টিকেট পরিবর্তনের সুযোগ পাওয়া যাবে।
ইরান সংঘাত যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে ২০২৬ সালে বিশ্বজুড়ে আকাশপথের সাধারণ ভ্রমণকারীদের জন্য এক কঠিন সময় অপেক্ষা করছে। একদিকে আকাশছোঁয়া ভাড়া, অন্যদিকে ফ্লাইটের অনিশ্চয়তা— সব মিলিয়ে বিশ্ব এভিয়েশন সেক্টর এখন এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
tags: iran conflict, aviation crisis, ticket price, fuel hike, air travel, global economy, jet fuel, flight cancellation