পৃথিবীর প্রায় ৯০টি দেশে কুমিরের অস্তিত্ব থাকলেও বাণিজ্যিকভাবে লোনা পানির কুমিরের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। বর্তমানে এটি একটি মাল্টিবিলিয়ন ডলারের শিল্পে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ লোনা পানির কুমির চাষের জন্য উপযুক্ত হাতেগোনা কয়েকটি দেশের মধ্যে একটি হওয়া সত্ত্বেও এই খাতে আশানুরূপ অগ্রগতি করতে পারছে না।
বিশ্ববাজারে লোনা পানির কুমিরের চাহিদা লোনা পানির কুমিরের পেটের চামড়া অত্যন্ত মসৃণ ও নমনীয় হওয়ায় আন্তর্জাতিক বিলাসবহুল ব্র্যান্ড যেমন হার্মিস, লুই ভিটন বা গুচির কাছে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। অন্য প্রজাতির চামড়ায় হাড়ের কণা থাকায় তা ট্যানিং বা সেলাইয়ের সময় ফেটে যায়, যা লোনা পানির কুমিরের ক্ষেত্রে হয় না। ফলে এর থেকে তৈরি মানিব্যাগ বা ব্যাগের দাম ৪০০ থেকে ১০০০ ডলার পর্যন্ত হয়ে থাকে।
প্রতিবেশী দেশগুলোর সাফল্য ও বাংলাদেশের অবস্থান থাইল্যান্ডে বর্তমানে এক হাজারের বেশি খামারে ১২ লাখের বেশি কুমির রয়েছে। ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়াও এই খাতে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। অথচ বাংলাদেশে বাণিজ্যিক কুমির খামারের সংখ্যা মাত্র দুটি। এর মধ্যে ময়মনসিংহের ভালুকায় অবস্থিত দেশের প্রথম কুমির খামারটি বর্তমানে মালিকানা বদল ও আইনি জটিলতায় জর্জরিত। রাঙামাটির অন্য খামারটিও নানা কারণে এগোতে পারছে না।
নীতিমালার জটিলতা ও উচ্চ ফি ২০১৯ সালে জারি করা ‘কুমির লালন-পালন বিধিমালা’ এই শিল্পের জন্য একটি বড় বাধা হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিধিমালার ৭(১) ধারা অনুযায়ী, প্রতিটি কুমিরের জন্য বার্ষিক এক হাজার টাকা পজেশন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। একটি খামারে ৪-৫ হাজার কুমির থাকলে বছরে কয়েক লক্ষ টাকা শুধু ফি দিতে হয়, যা উদ্যোক্তাদের জন্য বড় বোঝা। এছাড়া সাইটিস (CITES) রেজিস্ট্রেশনের জটিলতা তো রয়েছেই।
প্রশাসনিক বিড়ম্বনা ও উদ্দীপন-এর সংকট ভালুকার খামারটি উন্নয়ন সংস্থা 'উদ্দীপন' ক্রয় করলেও নানা প্রশাসনিক বাধার মুখে পড়ে। মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (MRA) এবং পরবর্তীকালে অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসকের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের কারণে খামারটির স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। দক্ষ কর্মীর অভাব এবং সঠিক নির্দেশনার অভাবে রপ্তানিযোগ্য চামড়া বা মাংস প্রক্রিয়াজাত করাও সম্ভব হচ্ছে না।
পরিবেশগত গুরুত্ব ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা কুমির ও ঘড়িয়াল জলাশয়ের ইকোসিস্টেম রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এরা রোগাক্রান্ত ও মরা মাছ খেয়ে পানি পরিষ্কার রাখে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০৩৩ সালের মধ্যে কুমির শিল্পের আন্তর্জাতিক বাজার ১৯.২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে। বাংলাদেশ যদি বিধিমালা সংশোধন করে এবং উদ্যোক্তাদের নীতিগত সহায়তা প্রদান করে, তবে এই খাতটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান উৎস হতে পারে।