একদিকে যুদ্ধের দামামা বন্ধ করে আলোচনার টেবিলে বসার আহ্বান, অন্যদিকে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখতে রণক্ষেত্রে সেনাসংখ্যা বৃদ্ধির তোড়জোড়—প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য নীতি এখন এই দুই বিপরীতমুখী মেরুতে অবস্থান করছে। ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য শান্তি আলোচনার আবহের মধ্যেই মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর পেন্টাগন (Pentagon) অঞ্চলটিতে সামরিক শক্তি কয়েক গুণ বৃদ্ধির পরিকল্পনা করছে। এর অংশ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত ১০ হাজার পর্যন্ত স্থলসেনা পাঠানোর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে হোয়াইট হাউস।
পেন্টাগনের ‘মিলিটারি অপশন’ ও ১০ হাজার সেনা মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। পেন্টাগনের পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বরাতে জানানো হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েনযোগ্য এই বিশাল বাহিনীতে মূলত পদাতিক সেনা (Infantry) এবং সাঁজোয়া যান (Armored Vehicles) অন্তর্ভুক্ত থাকবে। মূলত যুদ্ধের যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় ট্রাম্পকে অধিকতর ‘সামরিক বিকল্প’ (Military Option) সরবরাহ করতেই এই মাস্টারপ্ল্যান সাজানো হচ্ছে।
এয়ারবর্ন ডিভিশন ও মেরিন সেনাদের বিশেষ তৎপরতা ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের তথ্য অনুযায়ী, ওয়াশিংটন ইতোমধ্যেই মার্কিন বাহিনীর ৮২তম এয়ারবর্ন ডিভিশনের (82nd Airborne Division) প্রায় ৫ হাজার মেরিন সেনা এবং ২ হাজার প্যারাট্রুপারকে মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশে যাত্রার নির্দেশ দিয়েছে। যদি নতুন করে আরও ১০ হাজার সেনা যুক্ত হয়, তবে ওই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি এক অন্য উচ্চতায় পৌঁছাবে। তবে এই নতুন বাহিনীকে ঠিক কোথায় মোতায়েন করা হবে, সে বিষয়ে কৌশলগত কারণেই গোপনীয়তা বজায় রাখছে পেন্টাগন। এ বিষয়ে বিবিসি (BBC) যোগাযোগ করলেও হোয়াইট হাউস বা পেন্টাগন থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
ট্রাম্পের ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ পোস্ট ও ইরানের পাল্টা অবস্থান সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে (Truth Social) এক পোস্টে ডনাল্ড ট্রাম্প জানান, ইরান সরকারের বিশেষ অনুরোধে দেশটির জ্বালানি স্থাপনায় হামলা আপাতত ৬ এপ্রিল পর্যন্ত স্থগিত রাখা হয়েছে। ট্রাম্পের দাবি, তেহরান নিজেই এই ১০ দিনের সময় চেয়ে নিয়েছে। তবে নাটকীয় মোড় আসে যখন তেহরান এই দাবির তীব্র প্রতিবাদ জানায়। ইরান সরকার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, তারা ওয়াশিংটনের কাছে এ ধরনের কোনো অনুরোধ করেনি। এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানের মাঝেই মার্কিন বাহিনীর সেনা মোতায়েনের খবর মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে (Geopolitics) নতুন উত্তাপ ছড়িয়েছে।
কৌশলগত চাপের মুখে ইরান? প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ মূলত ‘ম্যাক্সিমাম প্রেশার’ (Maximum Pressure) পলিসির একটি অংশ। একদিকে আলোচনার প্রস্তাব দিয়ে বিশ্বমঞ্চে নিজেকে শান্তির দূত হিসেবে উপস্থাপন করা, অন্যদিকে অতিরিক্ত সেনা পাঠিয়ে ইরানকে স্নায়ুযুদ্ধের চাপে রাখা—এই দ্বিমুখী কৌশলই এখন ট্রাম্প প্রশাসনের মূল লক্ষ্য। সাঁজোয়া যান ও ভারী অস্ত্রের সমাগম মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি করতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অনেকে।
শেষ পর্যন্ত ১০ হাজার সেনা মোতায়েনের এই প্রস্তাব ট্রাম্প অনুমোদন করেন কি না, এবং ৬ এপ্রিলের পর ইরানের জ্বালানি স্থাপনা নিয়ে ওয়াশিংটন কী সিদ্ধান্ত নেয়, তার ওপরই নির্ভর করছে আগামীর বিশ্ব রাজনীতি ও তেলের বাজারের স্থিতিশীলতা।