ক্রীড়াবিশ্বের জীবন্ত কিংবদন্তি টাইগার উডস আবারও শিরোনামে, তবে এবার কোনো শিরোপার জন্য নয়, বরং এক ভয়াবহ গাড়ি দুর্ঘটনা ও আইনি জটিলতায়। শুক্রবার (২৭ মার্চ) ফ্লোরিডার জুপিটার আইল্যান্ডে নিজ বাড়ির কাছে এক সড়ক দুর্ঘটনার পর তাকে গ্রেফতার করে স্থানীয় পুলিশ। অভিযোগ উঠেছে, তিনি ‘নেশাগ্রস্ত’ বা ওষুধের প্রভাবে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে গাড়ি চালাচ্ছিলেন। গ্রেফতারের পর নির্ধারিত সময় হেফাজতে কাটিয়ে অবশেষে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন এই গলফ তারকা।
দুর্ঘটনার বিভীষিকা ও অলৌকিক রক্ষা
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, দুর্ঘটনার সময় টাইগার উডসের বিলাসবহুল ‘ল্যান্ড রোভার’ (Land Rover) গাড়িটি অন্য একটি গাড়িকে সজোরে ধাক্কা দেয়। সংঘর্ষের তীব্রতায় উডসের গাড়িটি রাস্তার পাশে একপাশে কাত হয়ে উল্টে যায়। সৌভাগ্যক্রমে, গাড়ির এয়ারব্যাগ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে বড় ধরনের শারীরিক আঘাত থেকে বেঁচে যান তিনি। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুর্ঘটনার পর উডস নিজেই গাড়ির যাত্রীবাহী দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন। তবে সে সময় তার আচরণে অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করা যায়।
ডিইউআই (DUI) অভিযোগ ও আইনি মারপ্যাঁচ
ঘটনাস্থলে পৌঁছানো মার্টিন কাউন্টি শেরিফ জন বুদিনসিয়েক জানান, উডসের মধ্যে অসামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণ ও বিভ্রান্তি দেখা যাচ্ছিল। পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে তাকে ‘ব্রেথালাইজার’ (Breathalyzer) পরীক্ষা করালেও তার শরীরে অ্যালকোহলের কোনো উপস্থিতি মেলেনি। তবে কর্মকর্তাদের সন্দেহ, তিনি কোনো শক্তিশালী ওষুধ বা মাদকদ্রব্যের প্রভাবে ছিলেন।
এরই প্রেক্ষিতে তাকে ডিইউআই (DUI - Driving Under the Influence) বা মাদকাসক্ত অবস্থায় গাড়ি চালানোর অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়। পুলিশের রেকর্ড অনুযায়ী, উডসের বিরুদ্ধে সম্পত্তির ক্ষতি (Property Damage), রাসায়নিক পরীক্ষায় অস্বীকৃতি এবং বেপরোয়া গাড়ি চালানোর অভিযোগ আনা হয়েছে। বিশেষ করে প্রস্রাব বা ইউরিন টেস্ট দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় তার বিরুদ্ধে আইনি অবস্থান আরও কঠোর হয়েছে। ফ্লোরিডার আইন অনুযায়ী, অন্তত আট ঘণ্টা পুলিশ হেফাজতে থাকার পর তিনি জামিনে মুক্তি পান।
পুরনো ক্ষত ও বারবার ছন্দপতন
টাইগার উডসের জীবনে গাড়ি দুর্ঘটনা নতুন কোনো ঘটনা নয়। গত দুই দশকে এটি তার চতুর্থ বড় ধরনের সড়ক দুর্ঘটনা। ২০১৭ সালেও তাকে গাড়ির ভেতর ঘুমন্ত ও নেশাগ্রস্ত অবস্থায় পাওয়ার পর তিনি ‘রেয়ারলেস ড্রাইভিং’-এর দায় স্বীকার করেছিলেন। ২০২১ সালে লস অ্যাঞ্জেলেসে এক ভয়াবহ দুর্ঘটনায় তার ডান পা প্রায় চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গিয়েছিল, যেখান থেকে দীর্ঘ ‘রিহ্যাবিলিটেশন’ (Rehabilitation) ও অস্ত্রোপচারের পর তিনি মাঠে ফিরেছিলেন। এছাড়া ২০০৯ সালেও বাড়ির কাছেই এক রহস্যময় দুর্ঘটনায় আহত হয়েছিলেন তিনি। বারবার এ ধরনের ঘটনায় তার ব্র্যান্ড ভ্যালু (Brand Value) ও ব্যক্তিগত ইমেজ চরম সংকটের মুখে পড়েছে।
ট্রাম্পের সমবেদনা ও বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া
এই ঘটনায় ক্রীড়ামহলে শোকের ছায়া নেমে এলেও টাইগার উডসের পাশে দাঁড়িয়েছেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এক বিবৃতিতে তিনি উডসকে একজন ‘অসাধারণ মানুষ’ হিসেবে অভিহিত করে এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভক্তদের একাংশ উডসের মানসিক স্বাস্থ্য ও পুনর্বাসন (Recovery) নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
গলফ কোর্সে অপ্রতিরোধ্য এই ‘টাইগার’ বাস্তব জীবনের পিচ্ছিল পথে বারবার কেন হোঁচট খাচ্ছেন, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। আইনি লড়াই শেষে তিনি আবারও সবুজে ঘেরা মাঠে ফিরতে পারবেন কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।