দেশের চিকিৎসা সেবার মান এবং জবাবদিহিতা নিয়ে আবারও বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। উচ্চ জ্বর, বমি, ডায়াবেটিস ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর সঠিক সময়ে চিকিৎসা ও ‘পোস্টঅপারেটিভ কেয়ার’ (Postoperative Care) না পাওয়ার কারণে ডা. চাঁদ সুলতানা ডোরার মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে তার পরিবার। শনিবার (২৮ মার্চ) দুপুরে প্রেসক্লাব যশোরে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে অভিযুক্ত চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির দাবি জানানো হয়।
চিকিৎসা সেবায় চরম গাফিলতির অভিযোগ
সংবাদ সম্মেলনে ডা. ডোরার মা শিরিন সৈয়দা বেগম কান্নায় ভেঙে পড়ে জানান, গত ২৯ জানুয়ারি রাত সাড়ে ১২টার দিকে সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় ডা. ডোরাকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালের জরুরি বিভাগে (Emergency Department) ভর্তি করা হয়। ভর্তির সময় তার শরীরে উচ্চ জ্বর, বমি ও শ্বাসকষ্টের মতো জটিল উপসর্গ ছিল। চিকিৎসকরা প্রথমে গর্ভস্থ শিশুর হার্টবিট স্বাভাবিক বলে আশ্বস্ত করলেও পরবর্তীতে আল্ট্রাসনোগ্রামের (Ultrasonogram) মাধ্যমে জানা যায় শিশুটি মৃত। কিন্তু ট্র্যাজেডি সেখানেই শেষ হয়নি।
৯ ঘণ্টার দীর্ঘ অপেক্ষা ও দায়হীনতা
পরিবারের মূল অভিযোগ হাসপাতালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট (Senior Consultant) ডা. রেহনুমা জাহানের বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, রোগীর অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন হওয়া সত্ত্বেও ডা. রেহনুমা রাতে রোগীকে দেখতে আসেননি। প্রায় ৯ ঘণ্টা পর সকালে তিনি এসে নামমাত্র রোগী পর্যবেক্ষণ করেন। ডোরার স্বামী ডা. মো. নজরুল ইসলাম অভিযোগ করেন, কোনো ধরনের গভীর শারীরিক পরীক্ষা বা ‘রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট’ (Risk Assessment) ছাড়াই চিকিৎসা প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছিল, যা একজন মুমূর্ষু রোগীর ক্ষেত্রে অমার্জনীয় অপরাধ।
আইসিইউ সংকটে ধুঁকেছেন চিকিৎসক
সংবাদ সম্মেলনে আরও দাবি করা হয়, রোগীর অবস্থা অবনতির দিকে গেলেও তা পরিবারের কাছে গোপন রাখা হয়েছিল। ডা. নজরুল ইসলাম জানান, সংকটাপন্ন অবস্থায় ডা. ডোরাকে প্রয়োজনীয় আইসিইউ (ICU) বা এইচডিইউ (HDU) সাপোর্ট দেওয়া হয়নি। এমনকি সংক্রমণের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও লাইফ-সেভিং অ্যান্টিবায়োটিক (Antibiotic) প্রদানেও অহেতুক বিলম্ব করা হয়েছে। একজন চিকিৎসক হয়েও নিজের স্ত্রীর জন্য সঠিক ‘মনিটরিং’ নিশ্চিত করতে না পারার আক্ষেপ প্রকাশ করেন তিনি। প্রশ্ন তোলেন, “একজন চিকিৎসক যদি চিকিৎসা নিতে এসে এমন অবহেলার শিকার হন, তবে সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা কোথায়?”
পরিবারের তিন দফা দাবি
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত এলাকাবাসী ও নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে তিনটি সুনির্দিষ্ট দাবি উত্থাপন করা হয়: ১. প্রধান অভিযুক্ত চিকিৎসক রেহনুমা জাহানের বিরুদ্ধে দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ। ২. ঘটনার সঠিক তদন্ত সাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট মেডিকেল টিমের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা। ৩. চিকিৎসার ক্ষেত্রে চরম অবহেলার দায়ে অভিযুক্তের ‘মেডিকেল লাইসেন্স’ (Medical License) বাতিল করা।
স্বাস্থ্যখাতে জবাবদিহিতার দাবি
সংবাদ সম্মেলনে ডোরার বাবা শেখ মনসুর উদ্দিন ও চাচা শেখ নিজাম উদ্দিনসহ অন্য স্বজনরা উপস্থিত ছিলেন। তারা সাফ জানিয়ে দেন, যদি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করে শাস্তি নিশ্চিত করা না হয়, তবে ভবিষ্যতে এ ধরনের ‘মেডিকেল নেগলিজেন্স’ (Medical Negligence) আরও বাড়বে। স্বাস্থ্যখাতে স্বচ্ছতা ও চিকিৎসকদের পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে তারা সরকারের সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।