রোববার ভোরে এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতার সাক্ষী হলো ইরানের রাজধানী তেহরান। যখন নগরীর মানুষ সবেমাত্র দিনের শুরু করছিলেন, ঠিক তখনই একের পর এক বিকট বিস্ফোরণে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে গোটা এলাকা। স্থানীয় সময় রোববার (২৯ মার্চ) ভোরের এই হামলায় বিশেষ করে উত্তর তেহরানের আকাশ ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। যুদ্ধের এক মাস পেরিয়ে এসে তেহরানের কেন্দ্রস্থলে এমন জোরালো আঘাত মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে এক নতুন ও চরম অনিশ্চিত পর্যায়ে নিয়ে গেছে।
সক্রিয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স জানিয়েছে, তাদের সাংবাদিকরা উত্তর তেহরানে স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ২০ মিনিটের দিকে অত্যন্ত শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পান। সেই সময় ইরানের ‘Air Defense System’ বা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সক্রিয়ভাবে কাজ করতে দেখা যায়। আকাশে লক্ষ্য করা গেছে মিসাইল ইন্টারসেপ্ট করার চেষ্টার ফলে সৃষ্ট আলোর ঝলকানি। তবে ঠিক কিসের ওপর এই হামলা চালানো হয়েছে বা হামলার উৎস কী, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তর তেহরানের একটি নির্দিষ্ট পাহাড়ি এলাকা থেকে ঘন কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলি বের হতে দেখা গেছে। মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে কয়েকটি বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটায় ওই এলাকায় চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
টার্গেট নিয়ে ধোঁয়াশা: সামরিক স্থাপনা নাকি সিভিলিয়ান এরিয়া? উত্তর তেহরানের যে এলাকায় ধোঁয়ার কুণ্ডলি দেখা গেছে, সেটি ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল। এই অঞ্চলে ইরানের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ‘Military Installations’ বা সামরিক স্থাপনা রয়েছে। আবার একই সঙ্গে এখানে সাধারণ মানুষের ঘনবসতিপূর্ণ ঘরবাড়িও বিদ্যমান। ফলে হামলাটি কি কোনো সুনির্দিষ্ট ‘Strategic Point’ লক্ষ্য করে চালানো হয়েছে, নাকি এটি জনবসতিপূর্ণ এলাকায় আঘাত হেনেছে, তা নিয়ে সংশয় কাটছে না। ইরানি বার্তাসংস্থা ‘ফার্স নিউজ’ কেবল বিস্ফোরণের খবর নিশ্চিত করে জানিয়েছে, বিস্তারিত তথ্য তারা পরবর্তীতে জানাবে।
এক মাসের রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও ধ্বংসযজ্ঞ গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ভূখণ্ডে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলা বা ‘Joint Operations’ শুরু হওয়ার পর থেকে চলমান এই যুদ্ধ আজ এক মাস অতিক্রম করল। এই ৩০ দিনে তেহরানসহ ইরানের বিভিন্ন প্রদেশে ব্যাপক বিমান ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী। পেন্টাগন ও আইডিএফ-এর দাবি অনুযায়ী, তাদের লক্ষ্যবস্তু মূলত ইরানের সামরিক অবকাঠামো। তবে বাস্তব চিত্রে দেখা যাচ্ছে, সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি ইরানের ‘Civilian Infrastructure’ বা বেসামরিক ঘরবাড়ি ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
আঞ্চলিক উত্তেজনার নতুন কেন্দ্রবিন্দু বিশ্লেষকদের মতে, তেহরানের উত্তর দিকের এই পাহাড়ি এলাকায় বিস্ফোরণ নির্দেশ করে যে, হামলাকারীরা এখন ইরানের একেবারে গভীরে এবং সুরক্ষিত এলাকায় আঘাত হানার সক্ষমতা দেখাচ্ছে। এর ফলে পাল্টাপাল্টি হামলার তীব্রতা আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে ওয়াশিংটন পোস্ট যখন মার্কিন বাহিনীর কয়েক সপ্তাহব্যাপী ‘Ground Offensive’ বা স্থল হামলার প্রস্তুতির খবর প্রকাশ করেছে, তখন তেহরানের এই বিস্ফোরণগুলো সেই বৃহত্তর পরিকল্পনারই অংশ কি না, তা নিয়ে কূটনৈতিক মহলে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।