দক্ষিণের দ্বীপে বিপুল গ্যাস মজুত, উৎপাদন সক্ষমতার অর্ধেকে
চলমান জাতীয় জ্বালানিসংকটের (Energy Crisis) মধ্যে দক্ষিণের দ্বীপজেলা ভোলার বিশাল প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুতকে কেন্দ্র করে নতুন করে মহাপরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। ভোলায় আবিষ্কৃত তিনটি গ্যাসক্ষেত্রের (Gas Field) মধ্যে দুটিতে এখনো উৎপাদন শুরু হয়নি। আড়াই দশক আগে আবিষ্কৃত শাহবাজপুর গ্যাসক্ষেত্র থেকে বর্তমানে যে পরিমাণ গ্যাস উৎপাদিত হচ্ছে, তা এর সক্ষমতার অর্ধেকেরও কম।
বিভিন্ন সূত্রমতে, ভোলায় প্রায় সোয়া ট্রিলিয়ন ঘনফুট (TCF) গ্যাসের প্রমাণিত মজুত রয়েছে। এত বিপুল পরিমাণ গ্যাস থাকা সত্ত্বেও ভোলার স্থানীয় চাহিদা সীমিত, আর ঢাকাসহ অন্যান্য শিল্পাঞ্চলে গ্যাস স্থানান্তরের প্রক্রিয়া ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং কার্যকারিতার দিক থেকে নগণ্য। বর্তমানে সিলিন্ডারে ভরে Compressed Natural Gas (CNG) আকারে দৈনিক ৫০ লাখ ঘনফুট গ্যাস জেলার বাইরে নেওয়ার কথা থাকলেও, সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ৮ থেকে ৯ লাখ ঘনফুট। এই পরিস্থিতিতে ভোলার গ্যাসকে স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নের Driving Force হিসেবে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
গ্যাস স্থানান্তরের চেয়ে স্থানীয় শিল্পায়নই অগ্রাধিকার
ভোলার গ্যাস কাজে লাগাতে সরকার এতদিন কয়েকটি বিকল্প নিয়ে চিন্তা করছিল। প্রথম বিকল্পটি ছিল পাইপলাইন (Pipeline) নির্মাণ করে গ্যাস রাজধানী বা পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে নিয়ে আসা। ভোলা থেকে বরিশাল হয়ে ঢাকায় পাইপলাইন আনার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ চলমান। দ্বিতীয় বিকল্প ছিল গ্যাসকে Liquefied Natural Gas (LNG) আকারে জাহাজে করে পরিবহন করা।
তবে এই বিকল্পগুলোর দুর্বল সফলতা এবং উচ্চ Investment ব্যয়ের কারণে এখন তৃতীয় এবং সবচেয়ে কার্যকর কৌশলকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে—তা হলো ভোলার গ্যাস স্থানীয় শিল্পায়নে ব্যবহার করা। এতে Infrastructure নির্মাণ করে গ্যাস বাইরে নেওয়ার খরচ বাঁচবে এবং ভোলাতেই ব্যাপক Job Creation হবে। দীর্ঘদিন ধরে ভোলার মানুষ বাসাবাড়িতে গ্যাস সংযোগের দাবি জানালেও, সরকার মনে করছে শিল্পায়ন হলে স্থানীয় মানুষজন বেশি উপকৃত হবেন।
ভোলার গ্যাস: নতুন মহাপরিকল্পনা ও Investment আকর্ষণ
জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ভোলার গ্যাস ব্যবহার করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পোদ্যোক্তাদের জন্য বিসিক শিল্পনগরী (BISIC), বড় উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ Industrial Park এবং বিদেশি বিনিয়োগ (Foreign Investment) আকর্ষণের লক্ষ্যে রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা (EPZ) গড়ার চিন্তা করছে সরকার। এর পাশাপাশি, সেখানে একটি বৃহৎ সার কারখানা (Fertilizer Plant) নির্মাণের জন্য জমি অধিগ্রহণ (Land Acquisition) করা হয়েছে।
এই পরিকল্পনাকে জোরদার করতে আজ শুক্রবার সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদলের ভোলা সফরের কথা রয়েছে। এই প্রতিনিধিদলে থাকছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন এবং শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান। তাঁদের সঙ্গে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (BERC) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ ও পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমানেরও যাওয়ার কথা। এই সফর মূলত Stakeholder-দের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা সাপেক্ষে কৌশলগত পরিকল্পনা চূড়ান্ত করার একটি ধাপ।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম নিশ্চিত করেছেন, ভোলার গ্যাসের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে এই তিন ধরনের শিল্প এলাকা গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। যেসব শিল্পকারখানায় স্থানীয় মানুষের ব্যাপক কর্মসংস্থান তৈরি হবে, তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। ভোলায় বিনিয়োগে উৎসাহ দিতে কম দামে গ্যাস সরবরাহের বিশেষ পরিকল্পনাও নেওয়া হচ্ছে।
বড় উদ্যোগ: প্রাণ-আরএফএল’র ৬ হাজার কোটি টাকার Industrial Park
সরকারি উদ্যোগের আগেই অবশ্য দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলো ভোলায় বড় আকারের Investment শুরু করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। তারা ভোলার সদর উপজেলার ভেদুরিয়া এলাকায় এক হাজার একর জমিতে প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগে একটি বিশাল Industrial Park গড়ে তুলতে চায়। এই প্রকল্পে ২৫ হাজারেরও বেশি মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থান হতে পারে বলে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান আহসান খান চৌধুরী মনে করেন, বিনিয়োগের জন্য ভোলা অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। তিনি বলেন, দেশের অধিকাংশ শিল্পকারখানা ঢাকা ও এর আশেপাশে, যেখানে গ্যাসের তীব্র সংকট। তাই যেসব এলাকায় গ্যাস সহজলভ্য, সেখানে কারখানা করায় মনোযোগ দিচ্ছে তারা। হবিগঞ্জের পর এটি হবে প্রাণ-আরএফএল’র দ্বিতীয় বৃহত্তম Industrial Park, যা ২০২৮ সালের মধ্যে পুরোপুরি উৎপাদনে যাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে।
এই Industrial Park-এ মূলত পাইপ, সিরামিক, গ্লাসওয়্যার, ফুটওয়্যার, চেয়ার, পানির ট্যাংকসহ যেসব পণ্যের উৎপাদনে প্রচুর গ্যাস দরকার, সেগুলোর কারখানা হবে। এসব পণ্য স্থানীয় বাজারে বিক্রির পাশাপাশি দেশের বাইরে রপ্তানিও করা হবে।
কম মূল্যে গ্যাস সরবরাহ ও অবকাঠামো উন্নয়নের শর্ত
নতুন শিল্পকারখানার জন্য বর্তমানে গ্যাসের দাম প্রতি ইউনিট ৪০ টাকা, পুরোনো কারখানায় ৩০ টাকা। কিন্তু ভোলায় নতুন শিল্প গ্রাহকদের প্রতি ইউনিট ৩০ টাকায় গ্যাস সরবরাহের চিন্তা করছে জ্বালানি বিভাগ। যদিও এর জন্য BERC-এর অনুমোদন নিতে হবে।
এই বৃহৎ শিল্পায়নকে সফল করতে হলে পর্যাপ্ত অবকাঠামো (Infrastructure) উন্নয়ন অত্যাবশ্যক। শিল্পোদ্যোক্তারা বিনিয়োগে উৎসাহী হবেন যদি ফেরি সেবা বাড়ানো, উন্নত রাস্তাঘাট, স্বাস্থ্যসুবিধা এবং ফায়ার সার্ভিসের সেবা উন্নত করা হয়। এছাড়া, নদীপথে পণ্য পরিবহনের সুবিধা কাজে লাগাতে একটি আধুনিক নদীবন্দর (River Port) নির্মাণ করা যেতে পারে বলেও বেসরকারি খাত থেকে দাবি জানানো হয়েছে। এটি একদিকে পণ্য পরিবহনে সড়কের ওপর চাপ কমাবে, অন্যদিকে পায়রা ও মোংলা বন্দরের ব্যবহারকেও বাড়াবে।